ব্রিটিশ আমলে নির্মিত চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতু দক্ষিণ চট্টগ্রামের সংযোগকারী অন্যতম যোগাযোগমাধ্যম। ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পর ২০১৩ সালে কর্ণফুলী নদীতে নতুন সেতু নির্মাণে বিশদ প্রকল্প পরিকল্পনা (ডিপিপি) তৈরি করে রেলওয়ে। কিন্তু নির্মিতব্য রেলসেতুতে সড়ক যান চলাচলের দাবিতে অনড় স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে প্রকল্পটি আটকে যায়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সেতুর উচ্চতা বেঁধে দেয়ায় ফের পিছিয়ে যায় প্রকল্প। চলতি বছরের শেষার্ধে কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শেষ হলেও পুরনো সেতু দিয়েই চলাচল করবে ট্রেন। স্থানীয়দের আন্দোলন ও রেলওয়ের অদূরদর্শিতায় দোহাজারী-কক্সবাজার পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই চলবে ট্রেন।

নতুন সেতু নির্মাণ প্রকল্পটিতে অর্থায়নের নিশ্চয়তা দিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ)। তবে বিআইডব্লিউটিএ কর্ণফুলী নদীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নৌপথ হিসেবে সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দেয়ায় নতুন করে সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়ন করা হয়। নতুন নকশায় প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ছে অন্তত সাড়ে ১২ গুণ। দ্বিতীয় ডিপিপিতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শুরুতে অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ওই সময়ে ভারতের লাইন অব ক্রেডিট, চীন, চেক প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান থেকে অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনাও হয়। শেষ পর্যন্ত কোরিয়ান ফান্ডে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে। ২০১৩ সালে হাতে নেয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১০ বছর পেরিয়ে যাওয়া ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি কারণ বলে মনে করছে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ।

চলতি বছরের শুরুতে ইউশিন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন ও দোহওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং যৌথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করেছে। ফিজিবল স্টাডি রিপোর্ট অনুযায়ী সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ১৩ কোটি ৪২ লাখ ডলার। বর্তমানে দেশে ডলার মূল্য ১০৭ টাকার হিসেবে মোট ব্যয় হবে ১৪ হাজার ৩৬২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইডিসিএফ দেবে ৮ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পের বাকি অর্থ ব্যয় করবে বাংলাদেশ সরকার। আগামী আগস্টে সেতুটি নির্মাণে কোরিয়ান সংস্থা ইডিসিএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু জাফর মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে পুরনো কালুরঘাট সেতুর পরিবর্তে নতুন সেতু নির্মাণ জরুরি। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নতুন সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন ও ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নও নিশ্চিত করা হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে ঋণচুক্তি সম্পন্ন করে ২০২৫ সালের প্রথম দিকে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’

রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় লাগবে পাঁচ-ছয় বছর। অর্থাৎ কাজ শুরুর পর ২০৩০ সালের আগে নতুন সেতু নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে না। বিদ্যমান কালুরঘাট সেতু সংস্কার ও নতুন সেতু নির্মাণসংক্রান্ত রেলওয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, বর্তমান কালুরঘাট সেতুর সমান্তরালে ৮০ মিটার উজানে ৮২০ মিটার দীর্ঘ একটি নতুন সেতু নির্মাণের প্রস্তাব থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হতে সাত-আট বছর সময় লাগবে।

২০২১ সালের ২১ জুন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ও বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে দেয়া ওই চিঠিতে নতুন আমদানি হওয়া ভারী লোকোমটিভ চলাচল ও স্বাভাবিক ট্রেন চলাচলের স্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরনো রেলওয়ে সেতুটি সংস্কারের আহ্বান করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু/পূর্ব)। এ অবস্থায় কক্সবাজার বাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হলেও ঝুঁকিহীন ট্রেন চলাচলের জন্য রেলওয়েকে আরো অন্তত ছয় বছর অপেক্ষায় থাকতে হবে বলে আশঙ্কা করছে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ।

রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, শুরুতে রেলওয়ে শুধু রেলের জন্য একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সেতু নির্মাণের বিষয়ে আন্দোলন শুরু হয়। যদিও ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একতলাবিশিষ্ট ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন রেল ও ডাবল লেনের সড়ক সেতু নির্মাণের নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর বিআইডব্লিউটিএ কর্ণফুলী নদীতে সেতু নির্মাণে উচ্চতা বেঁধে দেয় ১২ দশমিক ৭ মিটার। নতুন জটিলতা নিরসনে আরো সময়ক্ষেপণ হয়। পরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটারে ক্লিয়ারেন্স দিতে সম্মত হয় বিআইডব্লিউটিএ।

রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের মতে, ২০১৮ সালে ডিপিপি তৈরির সময় সেতুর দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটার ও বেড়িবাঁধ দুই কিলোমিটার। কর্ণফুলী নদীতে নৌযান চলাচলের জন্য সেতুর উচ্চতা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬২ মিটার। পরে নতুন নির্ধারিত সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটারের কারণে সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার। এসব কারণে সেতুর ব্যয় প্রায় সাড়ে ১২ গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ।