সুনামগঞ্জে একের পর এক বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে আরো তিনটি হাওর। ভারতের মেঘালয় থেকে ঢল নেমে হুমকির মুখে পড়েছে জেলার সবক’টি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জের ছাতক, শান্তিগঞ্জ ও মধ্যনগর উপজেলার তিনটি ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার ভোররাতে জেলার ছাতক উপজেলার হাঁটার হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। আগের দিন বুধবার বিকাল ও রাতে জেলার মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের রাঙ্গামটিয়া হাওর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার পুঁটিয়ার হাওরের বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০০ হেক্টর সোনালি ফসল তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগ বলছে. এ পর্যন্ত মোট ১৯টি হাওরে প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাওরের কৃষকরা জানান, বাঁধ নির্মাণে শুরু থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি। ফলে আগাম পাহাড়ি ঢলের পানিতে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে হাওরের বোরো ফসল। ২ এপ্রিল থেকে সব মিলিয়ে মোট ২১টি বাঁধ ভেঙে জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকের সোনালি ধান তলিয়ে গেছে। কিন্তু কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন তাদের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্তের পরিমাণ কম দেখিয়ে দায় এড়াতে চাইছে। সরকারি হিসাবে মাত্র সাত হাজার হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় চলতি বছর ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লাখ টন। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জেলার হাওর এবং হাওরের বাইরে ৮৪ হাজার ৭৭৯ হেক্টরের বেশি বোরো ধান কাটা হয়েছে। দ্রুত ধান কাটার জন্য ৫৭৪টি হারভেস্টার মেশিন এবং ১০৮টি রিপার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।
হাঁটার হাওরের কৃষক আখলাখুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন ধরে ঢলের পানির সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকরা যুদ্ধ করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। নিমিষেই তলিয়ে গেছে সোনালি ফসল। আমরা কৃষকরা যে যার মতো করে বোরো ধান কাটতে চেষ্টা করছি।
দেখার হাওরের কৃষক হাসান মিয়া বলেন, হাওরের বাঁধ ভাঙছে না কিন্তু ঢলের পানি এসে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। আর দুদিন গেলে ধান পুরোপুরি পানির তলে চলে যাবে। আমরা রাত-দিন স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ পাহারা দিচ্ছি। তবে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে জেলার সবক’টি বাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা যাচ্ছে না। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছি। তবে হাওরে পুরোদমে ধান কাটা চলছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৮৪ হাজার ৭৭৯ হেক্টরের বেশি বোরো ধান কাটা হয়েছে, যা মোট ধানের ৪৯ ভাগ। আমরা আশা করছি, দ্রুত হাওরের ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। তবে হাওরের বাইরের উঁচু জায়গার ধান কাটতে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে।
তবে হাওরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নৌযান চলাচলে কৃষকদের সুবিধার্থে সরকার দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার খাই হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, একটি হলো নদী খনন ও আরেকটি কজওয়ে নির্মাণ। বছরের শেষের দিকে এ দুটি প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে। এখন এর সমীক্ষার কাজ চলছে।
তিনি আরো বলেন, আশা করি আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে কাজ শুরু হবে। জেলার ১৪টি নদী ও এর সঙ্গে যত সংযোগ খাল রয়েছে, তা খননের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, নদীপথ দিয়ে নৌ চলাচলের জন্য ও ফসল কেটে কৃষক যেন তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য ৯০টি কজওয়ে রাখা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে কজওয়ের (বাঁধ) পয়েন্টগুলো জিও ব্যাগ দিয়ে বন্ধ রাখা হবে। যখন কৃষকের ফসল কাটা শেষ হয়ে যাবে, তখন কজওয়েগুলো খুলে দেয়া হবে। এ দুটি কাজ হলে আগামীতে এ রকম আগাম বন্যা হলে আমরা সহজে মোকাবেলা করতে পারব।










