জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ কমেছে। কারখানায় উৎপাদন চালু রাখতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপও পর্যাপ্ত নেই অনেকদিন ধরেই। এ অবস্থায় জাতীয় গ্রিডের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা। ছোট-বড় সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই এখন এলপিজি সরবরাহের অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গ্যাস, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ক্যাপটিভ হিসেবে পরিচিত এ বিদ্যুৎ দিয়ে গার্মেন্ট শিল্পে বৃহৎ পরিসরে বয়লার ও ডায়িং মেশিন চালু রাখা হয়। এর বাইরে ইস্পাত, ধাতব শিল্পসহ ইলেকট্রনিক সামগ্রী উৎপাদনকারী কারখানাগুলোয়ও গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। এজন্য জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহকৃত গ্যাসের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছিলেন উদ্যোক্তারা।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এ গ্যাসের চাপও পর্যাপ্ত মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছিল না বলে অভিযোগ শিল্পোদ্যোক্তাদের। বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাসের সঙ্গে এ নিয়ে বারবার আলোচনা করেও কোনো সমাধান মেলেনি। এর মধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজিসহ সব জ্বালানি পণ্যের দাম অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। স্পট থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের গ্যাস সরবরাহ আরো বাধাগ্রস্ত হয়। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গ্যাস সংযোগ পাচ্ছিল না নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও।

উপায়ান্তর না দেখে এখন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজিতে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো গ্যাসের চাপজনিত সমস্যা দীর্ঘদিনের। এ সমস্যার কোনো সমাধান দিতে পারছে না তিতাস। অন্যদিকে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ায় এখন ক্যাপটিভ চালু রাখতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ডিজেলের তুলনায় এলপিজিতে খরচ কিছুটা সাশ্রয়ী। এছাড়া এলপিজি ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখাও সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, জালালাবাদ মেটাল লিমিটেড, এসিআই, কিয়াম মেটাল, চিটাগং ফিড, হিরো হোন্ডা, আলফা কার্বন, এসিআই মোটরস, রাকা অ্যালুমিনিয়াম, পদ্মা ক্যানস অ্যান্ড ক্লোজার লিমিটেড, কুইনস বেকারি, গোল্ডেন হার্ভেস্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন কারখানা পরিচালনায় এলপিজি ব্যবহার শুরু করেছে। এর বাইরেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এলপিজি ব্যবহার করতে অবকাঠামোও নির্মাণ করছে।

দেশে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১০৯ টাকায়। প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৫ টাকা। আবার ভর্তুকি দেয়ার পরও শিল্প খাতে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ৪ ডলারে। এতে উদ্যোক্তাদের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশিতে। উৎপাদন খরচও বেড়েছে ব্যাপক হারে।

জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম এখনো অনেক বেশি। এর বিপরীতে এলপিজির কাঁচামালের দাম এখন কমছে। সৌদি আরামকোর মূল্যতালিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি মাসে দেশে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করেছে ১০২ টাকা ৮৮ পয়সা। অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের তুলনায় এখন বেশ সাশ্রয়ী দামেই এলপিজি সংগ্রহ করতে পারছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের অনেক শিল্প-কারখানায় এরই মধ্যে এলপিজির ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এসব এলাকার গার্মেন্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তারা এখন বয়লার ও ড্রায়ার মেশিন পরিচালনায় প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে এলপিজিকেই বেছে নিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের জায়গায় এলপিজিতে জেনারেটর চালানোর প্রযুক্তি এখনো সহজলভ্য নয়। তবে গ্যাসের চাপস্বল্পতা মোকাবেলায় এ ধরনের প্রযুক্তি বেশ ভালো ফল বয়ে আনতে পারে। কারখানা পরিচালনায় গ্যাসের চাপজনিত ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারেন শিল্পমালিকরাও।

জ্বালানি সংকট শুরুর অনেক আগে থেকেই পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল বলে জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাদের অভিযোগ, অবৈধ সংযোগের কারণে পাইপলাইনে বৈধ শিল্প গ্রাহকরা গ্যাসের চাপ পাচ্ছিলেন না। একটি লাইন থেকে অনেকগুলো অবৈধ লাইন তৈরি হলে সেখানে গ্যাসের চাপ কমে যায়। এছাড়া চাপ বাড়াতে একশ্রেণীর সংযোগদাতা মাসে মাসে চাঁদাও আদায় করছিলেন। এতে গ্যাসের ক্রয়মূল্যের বাইরেও এ বাবদ শিল্পমালিকদের ব্যয় অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

এতদিন পর্যন্ত শিল্প খাতে এলপিজি ব্যবহার নিয়ে বেশ অনীহা দেখিয়েছেন উদ্যোক্তারা। মূলত দাম ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কার কারণে পণ্যটি ব্যবহারে ইতস্তত করছিলেন তারা।

তবে গত কয়েক বছরে দেশে এলপিজি ব্যবসা বেশ সম্প্রসারিত হয়েছে। দেশের সব জায়গায়ই এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এলপিজি। গ্রাহকের কাছে পণ্যটি পৌঁছে দিতে এখন রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছেন অপারেটররা।

বেসরকারি বেশ কয়েকটি অপারেটরের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, মূলত ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়ার কারণেই উদ্যোক্তাদের কাছে এলপিজির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এটি ব্যবহারে খরচ ডিজেলের তুলনায় কম। আবার পাইপলাইনের গ্যাসের চেয়ে খরচ বেশি হলেও এলপিজি তুলনামূলক বেশি সহজলভ্য।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উদ্যোক্তারা এখন কারখানায় এলপিজি অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করছেন। বড় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয় দেড়-দুই কোটি টাকা। এক্ষেত্রে তাদের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন এলপিজি অপারেটররা।

এমনই একটি এলপিজি অপারেটর প্রতিষ্ঠান ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। বর্তমানে কোম্পানিটির আওতায় শিল্প সংযোগ রয়েছে ২০টিরও বেশি। গ্রাহকদের তালিকায় বিভিন্ন খাতের কয়েকটি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে দেড় হাজার টনেরও বেশি এলপিজি সরবরাহ করছে ওমেরা। প্রতি মাসেই এ চাহিদা বাড়ছে। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান এলপিজি সরবরাহের জন্য এরই মধ্যে ওমেরায় চাহিদাপত্রও পাঠিয়েছে।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, শিল্পে এলপিজির ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে এখানে বৃহৎ পরিসরে এলপিজি ব্যবহার করতে হলে অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সেটি হচ্ছেও। সরকার এ খাতে সহযোগিতা বাড়ালে এতদিন রান্নায় ব্যবহূত এ গ্যাসের ব্যবহার শিল্পের বৃহৎ পরিসরে বাড়ানোও সম্ভব হবে।

দেশে এলপিজির বাজারে ৪০-৪৫ শতাংশ এখন বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের দখলে। কোম্পানিটির ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫০-৩০০ শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে শিল্প খাতে এলপিজি গ্রাহক রয়েছে ২০-এর কাছাকাছি। প্রতিষ্ঠানটি এখন শিল্পমালিকদের কাছ থেকে এ ধরনের সংযোগ স্থাপন নিয়ে বেশ সাড়া পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বসুন্ধরার কর্মকর্তারা।

বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের হেড অব সেলস প্রকৌশলী জাকারিয়া জালাল বণিক বার্তাকে বলেন, এলপিজি এরই মধ্যে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দামের তারতম্যের কারণে এলপিজি এখন ডিজেলের তুলনায় সাশ্রয়ী। ফলে এলপিজি ব্যবহার নিয়ে শিল্প খাতে এক ধরনের আবেদন তৈরি হয়েছে। বৃহৎ পরিসরে না হলেও বয়লার, বার্নার ও বেকারিতে এ ধরনের সংযোগ দেয়ার সক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়েছে। তবে এখানে কারিগরি ও অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি সেটিকে কীভাবে মোকাবেলা করে এলপিজির ব্যবহার আরো দ্রুত বাড়ানো যায়।

দেশের বাজারে এলপিজি অপারেটর হিসেবে ব্যবসা রয়েছে ওরিয়ন গ্রুপেরও। বেশকিছু বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে এলপিজির সংযোগ নিচ্ছেন। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে এখন এলপিজি অপারেটর হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছে ২৭টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২০টি ব্যবসা করছে আমদানিকারক অপারেটর হিসেবে। প্রতি বছর দেশে ১১ লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়। এলপিজির গ্রাহক সংখ্যা ৪০ লাখ। এখন পর্যন্ত এ খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে সাড়ে চার লাখ মানুষের।