‘শিরক ও বিদআত’সহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের আলম মীরের কান্দি গ্রামের কুমার নদের খেয়াঘাটে শতবর্ষী একটি বটবৃক্ষ কেটে ফেলেছেন স্থানীয় কিছু মুসল্লি। স্থানীয়দের কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন এ বটবৃক্ষটি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিল।
গতকাল সোমবার (৫ মে) সকাল ৯টার দিকে তারা সেখানে গিয়ে বৃক্ষটি কাটা শুরু করেন। এরপর একে একে ডালপালা থেকে শুরু করে মূল বৃক্ষটির মাটি থেকে দণ্ডায়মান কাণ্ডগুলো কেটে ফেলা হয়।
বটবৃক্ষ কর্তনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানীয় বাসিন্দা বিষয়টি নিয়ে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সরেজমিন ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিরখাড়া ইউনিয়নের কুমার নদের আলম মীরের কান্দি গ্রামের খেয়াঘাটে প্রাকৃতিক নিয়মে জন্ম নেয়া বটবৃক্ষটির ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ রয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। সে বিশ্বাসের ধারণা থেকে নদীর পাড়ের এ বটবৃক্ষের গায়ে লাল শাড়ি ও কাপড় বাঁধা, মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে অনেকেই মানত করেন। এই ‘মানত’ করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে ‘শিরক ও বিদআত’ বলে আখ্যা দিয়ে গ্রামটির কিছু মুসল্লি ৫ মে সকালে করাত ব্যবহার করে পুরো গাছটি কেটে ফেলেন। এতে পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন, বটবৃক্ষ থেকে এই এলাকার প্রচুর মানুষ অক্সিজেন গ্রহণ করতেন। তাছাড়া বট গাছের ফল খেয়ে প্রচুর পাখি বেঁচে থাকত। নিরাপরাধ বটবৃক্ষটি কর্তনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও করেন তারা।

শিরখাড়া ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য বাবুল হোসেন বলেন, স্থানীয় কিছু মুসল্লি বটগাছটি কাটার বিষয়ে আমাদের কিছু জানায়নি। তবে লোকমুখে শুনেছি, অভিযুক্তরা দাবি করেছেন- বটগাছটিতে এসে মানুষ পূজা করে। মানত করে। অনেকে মনে করত গাছটির অলৌকিক ক্ষমতা আছে। এ বিষয়টিতেই এক শ্রেণীর লোকজন মনে করেছে- এসব বেদআত, শিরক। এই অভিযোগ নিয়ে তারা গাছটি কেটে ফেলেছে। তাদের হাত থেকে এখন গাছও বাঁচতে পারছে না। এই হলো অবস্থা। এখন প্রশাসনের কাছে দাবি করছি, এ ঘটনার একটি সুষ্ঠু বিচার তারা করুক।’
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল আহমেদ বলেন, গাছটি তো মানুষের কোনো ক্ষতি করেনি। তবুও এক শ্রেণীর লোক মানুষ এখানে মানত করে তা মেনে নিতে না পেরে পুরো গাছকেই হত্যা করল। যা অত্যন্ত খারাপ একটি উদাহরণ হয়ে রইল। এ ঘটনা যাতে আবারো না ঘটে তার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
এই ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে আজ মঙ্গলবার সকালে মাদারীপুর সদর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে যান।

এ বিষয়ে মাদারীপুরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি সকালেই আলম মীরের কান্দি গিয়ে বট গাছটিকে দেখে এসেছি। গাছটির ৯০ শতাংশই কেটে ফেলা হয়েছে। মাটির সঙ্গে দশ ফুট উচ্চতার দুটো মূলকাণ্ড তার ডালপালা বিহীন দাঁড়িয়ে আছে। বাকি সব মূলকাণ্ড ও ডালপালা কেটে ফেলা হয়েছে। আমি গাছটির মালিক হান্নান হাওলাদারের সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি বলেছেন মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকায় গাছটি বিক্রি করেছেন। অথচ গাছটির আর্থিক মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার কথা। আমরা তদন্ত করছি, তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করব। পরে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘বটগাছটি তো কারো কোনো ক্ষতি করেনি। এ গাছ আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন দেয়। গাছে পাখিরা বাসা বেঁধে থাকে। ফল খেয়ে থাকে। কিন্তু পুরনো বটগাছটির কাছে বিভিন্ন ধরনের মানুষ নানা রকমের মানত করে, এটা কিছু লোকজন ভালো চোখে দেখে না। তাই তারা পুরো গাছটিই কেটে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করল। গাছের ওপরের ডালপালাসহ নিজের গোড়ার অংশগুলোও কেটে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করছি।’
এ বিষয়ে মাদারীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘শিরখাড়ায় যে বটগাছটি স্থানীয়রা কেটে ফেলেছে। আমরা সেখানে প্রশাসনের লোক পাঠিয়েছি। যারা অভিযুক্ত তারা এখন গা ঢাকা দিয়েছে। আমরা তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’










