সুতার দাম ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, বিদেশী পণ্যের দৌরাত্ম্যসহ নানা সমস্যায় ধুঁকছে বগুড়ার বেনারসি পল্লী। একসময় বছরজুড়ে দম ফেলার সুযোগ না থাকলেও এখন আদি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন বেনারসি পল্লীর বাসিন্দারা। আগে অর্ধশতাধিক তাঁত মেশিন থাকলেও এখন রয়েছে ১৫টির মতো তাঁত মেশিন। অনেকেই লোকসানে পেশা বদল করেছেন। বেনারসি পল্লীতে এখন আর আগের সে অবস্থা নেই। কাজ চলছে ঢিমেতালে।
বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে শেরপুর উপজেলার ঘোলাগাড়ি কলোনি। বাইরের মানুষের কাছে ঘোলাগাড়ি কলোনি বেনারসি পল্লী নামেই সর্বাধিক পরিচিত। যুগ যুগ ধরে এ গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা বেনারসি শাড়ি তৈরি করা। গ্রামটিতে বর্তমানে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস।
গ্রামবাসী জানায়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারতের বিহার রাজ্য থেকে বাসিন্দাদের অধিকাংশ এ গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সে সময় কয়েকটি মেশিন দিয়ে বেনারসির কাজ শুরু হলেও পরে সেটি অর্ধশতাধিক মেশিন হয়ে যায়। এ গ্রামের মানুষ প্রধান পেশা হিসেবে বেনারসি শিল্পকে বেছে নিয়েই বেঁচে থাকার জীবন সংগ্রাম শুরু করে। সে সময় এ শিল্পই তাদের জীবনে বয়ে আনে সুখকর দিন। সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে নারীরাও এ পেশায় নিজেদের যুক্ত করেন। একসময় এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও কালের আবর্তে এর কদরে বেশ ভাটা পড়ে। বিদেশী শাড়ির প্রভাবে দেশীয় তৈরি বেনারসি শাড়ির বিপণন কমে যায়। রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে বেনারসি শাড়ি তৈরি প্রধান সুতার দাম বাড়তে থাকে। সে সঙ্গে বেড়ে যায় শ্রমিকের পারিশ্রমিক।
শেরপুর উপজেলার বেনারসি শাড়ির কারিগররা জানান, সরকার কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে আগে তাঁতিদের বা বেনারসি কারখানা মালিকদের মেশিনপ্রতি ১৮ হাজার টাকা করে ঋণ দেয়া হতো। বর্তমানে তা বাড়িয়ে প্রায় লাখ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকার ব্যবসায়ীরা সঠিক সময় তাদের পণ্যের দাম পরিশোধ না করায় ঋণের টাকা পরিশোধে হিমশিম খেতে হয়। কেননা অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের তৈরি পোশাকের বেশির ভাগ বিক্রি করতে হয় ঢাকায়। বছরে কেবল রমজানের ঈদে শাড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। এছাড়া বাকি সময় ধীরে ধীরে মেশিনগুলো চলে। বেনারসি তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে আগের মতো আর আয় হয় না। এ কারণে আদি ব্যবসা হলেও অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন আবার কেউ ধরে রেখেছেন।
বেনারসি পল্লীর মালিকরা জানান, বেনারসি শাড়ি তৈরির কাঁচামালের মূল্য বেশি হওয়ার কারণে এ শাড়ি তৈরি করে শ্রমিকের বেতন দিয়ে তেমন লাভের মুখ দেখতে পান না মালিকরা। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এ শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে মালিক ও কারিগরের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি প্রয়োজন।
কারখানার মালিক ও কারিগর আব্দুল কাদির এবং মো. আজাদ মঞ্জুর বলেন, ‘ছোট থেকেই আমরা এ পেশার সঙ্গে জড়িত। ১৯৯০ সালের পর থেকে এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। শেরপুর উপজেলার ঘোলাগাড়ি কলোনিতে তারাসহ হাতে গোনা কয়েকজন প্রথম শাড়ি বুননের কাজ শুরু করেন। প্রথমদিকে একটি শাড়ি তৈরিতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যেত। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। গ্রামীণ অবকাঠামো ভালো ছিল না। এখন কলোনিতে বিদ্যুৎ রয়েছে। রাস্তাঘাট আগের তুলনায় বেশ ভালো। বর্তমানে দুই দিনেই তৈরি করা যাচ্ছে উন্নতমানের একেকটি বেনারসি শাড়ি। এখন বাজারে বেনারসি পাইকারি বাজারে ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা, জামদানি ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাকিস্তান, তাইওয়ান, চায়না, ভারত ও দেশীয় সুতার ব্যবহার হয়ে থাকে এ শাড়িগুলোয়। এ এলাকার বেনারসি শাড়িগুলো ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়।
জাবির হোসেন এবং রশিদ মিয়া জানান, তাদের তৈরি শাড়িগুলো ঢাকার মিরপুর-১০, ১১, ১২-এর ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। মিরপুরের ব্যবসায়ীরা ঘোলাগাড়ি কলোনিতে তৈরি করা বেনারসি শাড়ির প্রধান ক্রেতা। এছাড়া উত্তরবঙ্গের বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁ, দিনাজপুর, নীলফামারী, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় এসব শাড়ি বিক্রি করা হয়। শাড়ি তৈরির কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে শাড়ি বিক্রি করে বেশি লাভবান হওয়া যাচ্ছে না বলেই অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
শেরপুর উপজেলার ঘোলাগাড়ি তাঁতি সমিতির আহ্বায়ক মো. ওয়াহেদ রানা বলেন, ‘আমি কারখানা মালিক ও কারিগর। বেনারসি পল্লীখ্যাত এ এলাকায় শাড়ি তৈরির কাজ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। যুগের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে এ শিল্প।










