দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে চার বছর ধরে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), যার পুরোটাই আমদানি করতে হচ্ছে। এ উৎস থেকে আসছে গ্রিডে সরবরাহকৃত গ্যাসের ২০ শতাংশের মতো। যদিও বিশ্ববাজারে পণ্যটির ঊর্ধ্বমুখী মূল্য সার্বিকভাবে গ্যাস খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় প্রভাব ফেলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে গ্যাস সরবরাহে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার ৮৩ শতাংশই খরচ হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে আরো এক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এরই মধ্যে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে সংস্থাটির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
কমিশনের তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রিড লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২০ হাজার ১১১ কোটি টাকার। এর মধ্যে শুধু এলএনজি কিনতেই ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহে ব্যয়িত অর্থের ৮৩ শতাংশ খরচ হয়েছে এলএনজি আমদানি বাবদ।
পেট্রোবাংলা বলছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এলএনজির বাজার এখন অস্থিতিশীল। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চলতি মাসে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির দাম ৪৯ ডলার ছুঁয়েছে। ফলে এখন স্পট থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি কেনার আর সুযোগ নেই।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে গত মাসে এক কার্গো এলএনজি কিনেছিল জ্বালানি বিভাগ। সেই সময় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি কেনা হয় ৩০ ডলারের কিছু বেশি দামে। গতকাল পেট্রোবাংলার আরো এক কার্গো এলএনজি আমদানি করার প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানি থেকে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানি করবে পেট্রোবাংলা। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ৩৬ ডলার ৭০ সেন্ট হিসেবে এই এক কার্গো এলএনজি আমদানিতে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ২৪১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবেই গ্যাসের দাম বাড়ছে। যুদ্ধ হবে সেটা কি কখনো ভেবেছি আমরা। অর্থনীতিতে নিশ্চয়তা ও অনিশ্চয়তা আছে। চ্যালেঞ্জিং এরিয়াগুলো যখন যেটা সামনে আসবে তখন কীভাবে তা মোকাবেলা করব, সে ধরনের পথ তৈরি করতে হবে।’
বিইআরসি তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে এলএনজি আমদানিতে পেট্রোবাংলার যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তাতে প্রতি ঘনমিটার আমদানীকৃত গ্যাসের দাম পড়েছে ৪৭ টাকা ২৬ পয়সা। এই হিসাব ধরে সংস্থাটি চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে প্রতি ঘনমিটারের দাম প্রাক্কলন করেছে ৫০ টাকা ৩৪ পয়সা।
চলতি অর্থবছরে পেট্রোবাংলার গ্যাস খাতে মোট ৫১ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে। যার মধ্যে শুধু এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার ২২২ কোটি টাকা।
এ ব্যয় মেটাতে এরই মধ্যে পেট্রোবাংলা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে কমিশনে। সেখানে পেট্রোবাংলা মিশ্রিত গ্যাসের মূল্য প্রতি ঘনমিটার ১২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ৩০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
এছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এলএনজিসহ পেট্রোবাংলার পরিচালন বাবদ ব্যয় হয়েছে ১০২ কোটি টাকা, সঞ্চালনে ব্যয় হয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা। প্রতি ঘনমিটার গ্যাস সঞ্চালন করতে খরচ হয়েছে ৪২ পয়সা।
অন্যদিকে পেট্রোবাংলা কর্তৃক চলতি অর্থবছরের জন্য এলএনজিসহ পরিচালন ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৩৪ কোটি টাকা, সঞ্চালন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা এবং প্রতি ঘনমিটার গ্যাস সঞ্চালন খরচ ধরা হয়েছে ৪৬ পয়সা।
তবে পেট্রোবাংলার ব্যয়ের এ প্রাক্কলন যখন করা হয়েছিল, স্পট মার্কেটে তখন প্রতি এমএমবিটিইউ এলএলজির দাম ছিল ৩০ ডলারের মধ্যে। বর্তমানে পণ্যটির দামের ঊর্ধ্বগতিতে সার্বিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে স্পট থেকে এলএনজি আমদানি ব্যয় না বাড়িয়ে দেশীয় গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, এলএনজির বাজার অস্থিতিশীল। প্রতিনিয়ত ওঠানামা হচ্ছে। আমরা এলএনজি আমদানিতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে তা প্রাক্কলন করেছিলাম। কিন্তু এটা এখন বলা মুশকিল আগামীতে কী হবে। তবে স্পট মার্কেটের উচ্চমূল্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে বিবিয়ানায় কম্প্রেশার বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়ানোর কাজ চলছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতারের সঙ্গে আমদানি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়েও আমরা কথা বলেছি।
প্রসঙ্গত, দেশের জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৩০০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে দৈনিক ৭০ কোটি ঘনফুট দেয়া হচ্ছে এলএনজি। যার মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ যাচ্ছে স্পট থেকে আমদানি করা এলএনজি।
চলতি অর্থবছরে যে প্রাক্কলন করা হয়েছে সেখানে দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করার কথা। এর ভিত্তিতেই এলএনজি আমদানি বাবদ অর্থ ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। যদিও প্রাক্কলন অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে এ পরিমাণ এলএনজি সরবরাহ করার কথা থাকলেও বর্তমানে একটি টার্মিনাল সংস্কারের কারণে চার মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে এলএনজির প্রাক্কলন করা হলেও সেটি এখন গ্রিড লাইনে সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে স্পট মার্কেট থেকে ১৩ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা ছিল পেট্রোবাংলার। দুটি কার্গো এরই মধ্যে দেশে এলেও মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাকি কার্গো কেনা যাবে কিনা তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানীকৃত জ্বালানির প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এ খাতে অতিমাত্রায় ব্যবসা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকে যাওয়ায় দেশীয় অনুসন্ধান কার্যক্রমে মনোযোগ দেয়া যায়নি। ফলে এ অবস্থা যে তৈরি হবে তা সহজেই অনুমেয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, গ্যাস খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করার জন্য আমাদের গ্যাসের প্রয়োজনের সবটুকুই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার প্রয়োজন ছিল। যেহেতু আমাদের প্রয়োজন সেহেতু এটা করা যেত। তবে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে বিশ্ববাজার থেকে কম দামে গ্যাস কেনার সুযোগ নেই। বরং সেই অর্থ দিয়ে দেশের অফশোর-অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো দরকার। যদিও এরই মধ্যে জ্বালানি বিভাগ বেশকিছু এলাকায় কার্যক্রম শুরু করেছে।
দেশে গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সংকট থাকায় শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতে তার প্রভাব পড়ছে। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে এলএনজি আমদানির জন্য গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হলে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে জনজীবনে। ফলে এ অবস্থা উত্তরণে এলএনজি আমদানির বিপরীতে বরং স্পট মার্কেট থেকে যতটুকু গ্যাসের প্রয়োজন তা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দেয়া সম্ভব।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, স্পট মার্কেট থেকে যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে সেই পরিমাণ গ্যাস আইওসি এবং দেশীয় কোম্পানির গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ করা সম্ভব। বিশেষ করে তিতাসের গ্যাসফিল্ডে যথাসময়ে কম্প্রেশার বসানো গেলে এ সংকট থাকত না। যদিও গত পাঁচ-ছয় বছরে তা করা যায়নি।










