রাজধানীর বনশ্রী এলাকা। সুরম্য অট্টালিকা ও সুপ্রশস্ত সড়কের এলাকাটিতে নগরায়ণের ছোঁয়া ছিল না কয়েক দশক আগেও। বর্তমানের বনশ্রীকে ওই সময়ের সঙ্গে মেলানো যায় না কোনোভাবেই। সুপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প যে একটি এলাকার চেহারা বদলে দিতে পারে, তার বড় উদাহরণ বনশ্রী। এলাকাটির এ আমূল রূপান্তরের বড় কারিগর বলা হয় আবাসন খাতের উদ্যোক্তা জহুরুল ইসলামকে।

শুধু বনশ্রী নয়, রাজধানীর পল্লবী, আফতাবনগর, রূপনগর, গোড়ান, নিকেতন, মহানগর, মাদারটেক, মায়াকুঞ্জ ইত্যাদি এলাকারও আমূল পরিবর্তনের রূপকার জহুরুল ইসলাম। এসব এলাকায় বিভিন্ন আয়তনের আবাসিক প্রকল্প গড়ে তুলেছেন তিনি। এসব প্রকল্পে ছোট, বড়, মাঝারি আকারে প্লট রয়েছে ৫০০ থেকে কয়েক হাজার। প্রকল্পগুলোয় গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, শিশুপার্ক, সুপার মার্কেটসহ নানা নাগরিক সুযোগ-সুবিধা।

বলা হয়, ঢাকার নগরায়ণে ৪০ শতাংশ জহুরুল ইসলামের অবদান। অপরিকল্পিত ও দূষণযুক্ত রাস্তাবিহীন শহরের বিপরীতে তিনি প্রথম গড়ে তুলেছেন অসংখ্য আবাসিক প্রকল্প, অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। ঢাকার নগর ভবন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের শপিং কমপ্লেক্স ও অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প তার গড়ে তোলা। তার প্রতিষ্ঠিত ইষ্টার্ণ হাউজিং লিমিটেড, ইষ্টার্ণ টাওয়ার, ইষ্টার্ণ ভিউ, ইষ্টার্ণ পয়েন্ট, ইষ্টার্ণ ভ্যালি, ইষ্টার্ণ নিকুঞ্জ ইত্যাদি নানা আবাসন প্রকল্প নগরবাসীর মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য যেসব স্থাপনা তার হাতে তৈরি সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা সিটি করপোরেশন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল, জীবন বীমা ভবন, সাধারণ বীমা ভবন, টয়োটা ভবন ইত্যাদি।

দেশের আবাসন খাতের রূপান্তরের এ কারিগরের ব্যবসায়িক যাত্রা হয়েছিল দেশভাগের কয়েক বছর পর। প্রতিকূল পরিবেশে শুরু করে খাতটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন তিনি। স্বাধীনতার পর দেশের আবাসন খাত এগিয়েছে মূলত তার দেখানো পথেই। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের আধুনিক নগরায়ণের ইতিহাস জহুরুল ইসলামকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ও শামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর শামসুল আলামিন বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাধীনতার আগে বাঙালিদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ ছিল কম। ওই সময় আমাদের এখানে যারাই ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ব্যবসা করতে হয়েছে। ওই রকম একটা পরিস্থিতিতেও ইসলাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জহুরুল ইসলাম ইষ্টার্ণ হাউজিং নামে একটা প্রতিষ্ঠান করেছিলেন। তিনিই প্রথম বেসরকারি খাতের হাউজিং ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। ৭৫-পরবর্তী সময়ে আবাসন খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার কোনো উদ্যোগ ছিল না। আশির দশকের শেষের দিকে ব্যক্তি খাতে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকে আবাসন খাত নিয়ে বেসরকারি খাতের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ফ্ল্যাট তৈরি করার ধারণাটি তখন প্রতিষ্ঠা পেল। এ ধারণার বাস্তবায়নেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জহুরুল ইসলাম। বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট গড়ে তুলে বসবাস করার চর্চাটা ওই সময়ই গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে এ ধারণার পথিকৃৎ হলেন জহুরুল ইসলাম।

দেশে আধুনিক আবাসন ব্যবসার রূপকার জহুরুল ইসলাম উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। আর্থিক টানাপড়েন তাকে সে সুযোগ দেয়নি। এ কারণে দেশভাগের অব্যবহিত পরই ১৯৪৮ সালে চাকরিতে ঢোকেন তিনি। পেশা জীবনের শুরু সিঅ্যান্ডবির ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। তত্কালীন ৮০ টাকা মাসিক বেতনে। তবে চাকরির চেয়ে ব্যবসার প্রতিই তার আকর্ষণ বেশি। এ কারণে পদোন্নতির প্রলোভন উপেক্ষা করে তিন বছরের মাথায় চাকরি ছাড়েন তিনি। যোগ দেন বাবার ঠিকাদারি ব্যবসায়।

পিতার ছোটখাটো ওই ব্যবসায়ে সহায়তাকারী হিসেবে বিভিন্ন স্থানে পরিচিত হন। পরবর্তী সময়ে ঠিকাদার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন নিজেই। ‘বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ তার প্রতিষ্ঠিত ইসলাম গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান।

ঠিকাদার হিসেবে প্রথম কাজ ছিল সরকারি অফিসে স্টেশনারি দ্রব্য সরবরাহ করা। দ্বিতীয় কাজ ছিল কিশোরগঞ্জ পোস্ট অফিস ঘর নির্মাণ। একপর্যায়ে প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদারের স্বীকৃতি পান তিনি। একের পর এক কাজ আসতে থাকে তার হাতে।

এক পর্যায়ে দেশে ও দেশের বাইরে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে তার। কাজের সুবিধার্থে ১৯৭১ সালে লন্ডনে একটি অফিস খোলেন তিনি। ব্যবসার পাশাপাশি সে সময় দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও নানাভাবে আর্থিক সহায়তা করেছেন তিনি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তান সরকারের জেলে আটক ভাষাসৈনিকদের মোকদ্দমা ও আহতদের চিকিৎসার খরচ জুগিয়েছেন। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ব্যয়ও বহন করেছেন ব্যক্তিগতভাবে। সুবিদ আলী ছদ্মনামে লন্ডনে থেকেও দেশের মুক্তিযুদ্ধে আর্থিক সহায়তা করেছেন তিনি। প্রেরণা জুগিয়েছেন স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তার কর্মোদ্যোগ আরো বিস্তৃতি লাভ করে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখতে থাকেন তিনি। অন্যদিকে দেশের বাইরেও পদচারণা বাড়ছিল তার।

১৯৭৫ সালে বিডিসি মধ্যপ্রাচ্যে কাজ শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেখানে সড়ক, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তিনি। আবুধাবিতে ৫ হাজার বাড়ি বানিয়েছেন। ইরাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অত্যাধুনিক ইট তৈরির কারখানা স্থাপনের কাজ করেছেন। ইয়েমেনের রাজধানীর পাশে একটি উপশহরের নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ ছিল তার। ইরাকে বিখ্যাত সিটি সেন্টার ও আবদুল কাদির জিলানি (র.) মাজার শরিফ কমপ্লেক্সের পাশে একটি আধুনিক মানের গেস্টহাউজসহ (বিনা লাভে) অসংখ্য স্থাপনা তৈরি করেছেন তিনি। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাংলাদেশী শ্রমবাজার তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন তিনি।

ঠিকাদারির পাশাপাশি অন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ও উদ্যোগী ছিলেন জহুরুল ইসলাম। তার সম্পৃক্ততায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে প্রায় দুই ডজন। ইষ্টার্ণ হাউজিং লিমিটেড, নাভানা, আফতাবসহ এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক খাতের আইএফআইসি ও উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড।

জানতে চাইলে ইষ্টার্ণ হাউজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ধীরাজ মালাকার বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের আধুনিক আবাসন খাতের বিষয়ে বলতে গেলে জহুরুল ইসলামের নামটি সবার আগে আসবে। তার কাজ এখনো আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।