চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় নয় লাখ টন চাল আমদানি করেছে। এর মধ্য দিয়ে এ মুহূর্তে ভারতে উৎপাদিত চালের সবচেয়ে বড় বাজার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর দেশে পণ্যটির উৎপাদন হয়েছে কম। চালের সরকারি মজুদও কমে আসছিল। বাজার অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে ভারতসহ বিভিন্ন উৎস দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। আমদানি অবারিত করার পাশাপাশি শুল্কহারও কমিয়ে আনা হয়। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী ভারত থেকে পণ্যটির আমদানি বাড়িয়ে তোলেন ব্যবসায়ীরা। মজুদ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারি পর্যায় থেকেও পণ্যটির আমদানি বাড়িয়ে তোলা হয়। খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার তথ্যেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন কৃষি বিভাগের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে চাল আমদানি হয়েছে অনেক কম। সারা বছরে দেশে পণ্যটির আমদানি হয়েছে মোটে ৬০ হাজার টন। কিন্তু বাজার অস্থিতিশীলতার শঙ্কায় বছরের শেষ দিকে এসে আমদানি অবারিত করে দেয় সরকার। পরিবর্তন আনা হয় শুল্কহারেও। ফলে ভারত থেকে পণ্যটির আমদানি বেড়ে যায়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় নয় লাখ টনে। বছরের বাকি সময়জুড়েও দেশে পণ্যটির অতিরিক্ত আমদানি চাহিদা বজায় থাকতে পারে। সব মিলিয়ে এ বছর ভারত থেকে মোট প্রায় ১৫ লাখ টন চাল আমদানি করতে পারে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারীর কারণে গত বছর দেশে চালের উৎপাদন হয়েছিল কম। সরকারি মজুদও নেমে এসেছিল আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। ফলে বাজার হয়ে উঠেছিল অস্থিতিশীল। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। কমানো হয় আমদানি শুল্ক। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি খাতের ব্যবসায়ীরা আমদানি বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি পর্যায়েও খাদ্য অধিদপ্তর সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানি বাড়িয়ে তোলে।

খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বণিক বার্তাকে বলেন, বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি ভোক্তাদের সুবিধায় চাল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। চাহিদা বাড়তির দিকে থাকায় ভারত থেকে বেশি পরিমাণে চাল আমদানি করা হয়েছে। প্রতিবেশী হিসেবে দেশটি থেকে দ্রুত ও সাশ্রয়ী মূল্যে ভালোমানের চাল আমদানি করা যায়। তবে আমরা আমদানিতে এক দেশনির্ভর না থেকে বহুমুখী উৎস থেকে আমদানি করছি। বর্তমানে মিয়ানমার ও ভিয়েতনাম থেকেও চাল আমদানি করা হচ্ছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ৮ জুন পর্যন্ত হালনাগাদকৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে প্রায় ১২ লাখ ৬২ হাজার টন; যা সরকারিভাবে ৪ লাখ ৭৬ হাজার টন ও বেসরকারিভাবে ৭ লাখ ৮৬ হাজার টন।

সংস্থাটির নিয়মিত প্রকাশনা ‘গ্রেইন: ওয়ার্ল্ড মার্কেটস অ্যান্ড ট্রেডে’ বলা হয়, বাংলাদেশের পরই ভারতের চালের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার সেনেগাল। দেশটিতে বছরের প্রথম তিন মাসে পাঁচ লাখ টনের সামান্য কম পরিমাণে চাল রফতানি করেছে ভারত। এছাড়া সৌদি আরব, নেপাল, বেনিন ও ইরাকেও ভারতীয় চালের বড় বাজার রয়েছে। এছাড়া চীনও প্রায় এক দশক পর ভারত থেকে চাল আমদানি শুরু করেছে। ভারতীয় চালের প্রধান সব বাজারেই পণ্যটির চাহিদা এখন বাড়তির দিকে। এ চাহিদা কাজে লাগিয়ে চলতি বছর ১ কোটি ৭০ লাখ টন চাল রফতানির পরিকল্পনা করছে ভারত।

এদিকে দেশে এবার আমন ও আউশ মৌসুমে চালের উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে শঙ্কা রয়েছে সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমের উৎপাদন নিয়ে। হিটশক ও শিলাবৃষ্টির কারণে এবারে বোরোর ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৬৯ হাজার হেক্টর জমির ধান হিটশক ও শিলাবৃষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ধানের বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দেয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। যদিও কৃষিমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, হাইব্রিড ধানের আবাদ ও সম্প্রসারণ কর্মীদের উদ্যোগের কারণে বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন ২ কোটি ১০ লাখ টন ছাড়াতে পারে।

দেশের চাল উৎপাদন ও আমদানি পরিস্থিতি নিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় আমদানির অনুমতি দেয়া হলেও দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। মহামারী পরিস্থিতির মধ্যে চালের জন্য কোথাও দুর্ভিক্ষ হয়নি। এমনকি হাহাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।