কভিডের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বৈশ্বিক এভিয়েশন খাত। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) তথ্য বলছে, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বাজারও বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসের আগের অবস্থার কাছাকাছি চলে এসেছে। দেশের এভিয়েশন খাত ঘুরে দাঁড়ালেও রাজস্ব প্রত্যাবাসন নিয়ে সংকটে পড়েছে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো। আইএটিএর তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর রাজস্ব আটকে থাকার পরিমাণ ২০ দশমিক ৮ কোটি ডলার। এ নিয়ে ৭ ডিসেম্বর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের যেসব দেশে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর রাজস্ব আটকে আছে, সেগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে বাংলাদেশ। এয়ারলাইনসের রাজস্ব আটকে রাখার ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান।

ডলার সংকট এবং বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক রাজস্ব অর্থ আটকে রেখেছে এয়ারলাইনসগুলোর—এমন অভিযোগ করছেন বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করা বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর কর্মকর্তারা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিষয়টি মানতে রাজি নন। তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে বিদেশী এয়ারলাইনসের রাজস্ব প্রত্যাবাসনের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব প্রত্যাবাসনের এ জটিলতার কারণে দেশের এভিয়েশন খাত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকিট বিক্রি ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করে এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলো। সেখান থেকে আয় হওয়া রাজস্ব কোম্পানিগুলো নিজ দেশে নিয়ে যায়। তবে এজন্য যে দেশ থেকে রাজস্ব নিয়ে যাওয়া হবে, সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগে। অভিযোগ রয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিভিন্ন দেশ বিদেশী কোম্পানিগুলোর রাজস্ব আটকে রাখছে বা তাদের রাজস্ব প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করছে। এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলোও রয়েছে এ তালিকায়।

আইএটিএ বলছে, বিশ্বের ২৭টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে এয়ারলাইনসগুলোর রাজস্ব আটকে পড়েছে। গত ছয় মাসে রাজস্ব আটকে রাখার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে এয়ারলাইনসগুলোর প্রায় ২০০ কোটি ডলার আটকে আছে। সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আটকে আছে নাইজেরিয়ায়। দেশটি থেকে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার রাজস্ব প্রত্যাবাসন করতে পারছে না বিভিন্ন এয়ারলাইনস। নাইজেরিয়ায় এয়ারলাইনসগুলোর রাজস্ব প্রত্যাবাসন সংকটটি তৈরি হয় ২০২০ সালের মার্চে। বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় দেশটিতে এ সংকট দেখা দেয়।

২০ কোটি ৮০ লাখ ডলার রাজস্ব আটকে রেখে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এয়ারলাইনসের রাজস্ব আটকে রাখা দেশগুলোর তালিকায় চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে লেবানন ও আলজেরিয়া। এর মধ্যে লেবাননে ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার ও আলজেরিয়ায় ১৪ কোটি ডলার আটকে আছে।

রাজস্ব প্রত্যাবাসন সংকটের কারণে এরই মধ্যে ভঙ্গুর দশায় পৌঁছেছে ভেনিজুয়েলার এভিয়েশন খাত। ২০১৬ সাল থেকে দেশটিতে এ সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার দেশটিতে আটকে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশটি থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে বিভিন্ন এয়ারলাইনস, যার ধাক্কায় ২০১৯ সালে ভেনিজুয়েলা থেকে আকাশ যোগাযোগ ৬০ শতাংশ কমে। এ পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে।

রাজস্ব প্রত্যাবাসন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে বাংলাদেশ থেকেও বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে বলে মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজস্ব প্রত্যাবাসন জটিলতার কারণে কিছু এয়ারলাইনস তাদের চলাচল সীমিত করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। আগামীতে যদি এটা চলমান থাকে, তাহলে অনেক এয়ারলাইনস বাংলাদেশ থেকে ধীরে ধীরে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেবে। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের জন্য এটা বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।’

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক দাবি করেন, বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর রাজস্ব প্রত্যাবাসনে কোনো জটিলতা নেই। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুয়েকটি এয়ারলাইনস তাদের যাত্রীর তালিকা সরবরাহ করেনি। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই তাদের পুরো “পেমেন্ট” আটকে যাওয়ার কথা। কিন্তু যেসব এয়ারলাইনস রাজস্ব প্রত্যাবাসনের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, তাদের “পেমেন্ট” ঠিকমতোই পরিশোধ করা হচ্ছে।’