বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেল ভরাট করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য স্থাপনা। পুরনো সিএস মানচিত্র অনুসরণের মাধ্যমে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর আদি চ্যানেল উদ্ধার করা হবে বলে জানিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। যদিও উদ্ধার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি করছেন পরিবেশকর্মীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, নদীর চ্যানেল উদ্ধারে ডিএসসিসি অভিযান চালালেও সেখানে গড়ে ওঠা প্রভাবশালীদের শিল্প-কারখানাগুলো এর আওতার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

ডিএসসিসির ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গড়া ওঠা কামরাঙ্গীরচর মূলত বুড়িগঙ্গার বুকে জেগে ওঠা একটি চর। রাজধানীর সোয়ারীঘাটের পশ্চিমে চাঁদনীঘাট। এখান থেকে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার উত্তর দিকের শাখাটি আদি চ্যানেল। আর দক্ষিণের শাখাটি এখনকার মূল বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার এ দুই ধারার মাঝখানে কামরাঙ্গীরচর, নবাবগঞ্জ চরসহ কয়েকটি এলাকার অবস্থান। কামরাঙ্গীরচর অংশের অল্প কিছুদূর ছাড়া এ চ্যানেলের পুরোটাই এখন ভরাট হয়ে গিয়েছে। কয়েক দশক আগেও রাজধানীর হাজারীবাগ, রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেল। বর্তমানে এ চ্যানেলের প্রায় পুরোটাই এখন ভরাট হয়ে পড়েছে। ভরাট হয়ে পড়া চ্যানেলের বুকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাড়িঘর-বহুতল ভবন। গত ২৯ জুন অভিযান চালিয়ে নদীর আদি চ্যানেল উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছিল ডিএসসিসি। এতদিন ডিএসসিসির পক্ষ থেকে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী আদি চ্যানেল খনন করার কথা বলা হলেও তা করছে না সংস্থাটি। পরিবেশকর্মীসহ এলাকাবাসী বলছেন, প্রভাবশালীদের শিল্প-কারখানা বাঁচাতেই এ ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৯-এ বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল দখল করে ম্যাটাডোর পার্ক, পান্না ব্যাটারি কারখানা, শিকদার মেডিকেল, সুগন্ধা কৃষি মার্কেট ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া আদি চ্যানেল এলাকায় নামে-বেনামে সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য দখল রয়েছে। ডিএসসিসি খননকাজ শুরু করলেও প্রভাবশালীদের স্থাপনা উচ্ছেদ করছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, শুরুতে ডিএসসিসি ঘোষণা করেছিল সিএস ম্যাপ অনুযায়ী আদি চ্যানেল খনন করা হবে। কিন্তু কাজ শুরু হলে দেখা যায়, সেখানে আদি চ্যানেলের একটি অংশ সরু করে খনন করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা রক্ষার জন্যই ডিএসসিসি ঘোষণা দেয়ার পরও সিএস ম্যাপ অনুযায়ী আদি চ্যানেল খনন করছে না।

সরেজমিন দেখা যায়, কামরাঙ্গীরচর এলাকার ম্যাটাডোর পার্কের পাশে ডিএসসিসি আদি চ্যানেলটিতে খননকাজ করেছে। এর ফলে দীর্ঘ সময়ের শুষ্ক পয়েন্টে পানির চিহ্ন দেখা গিয়েছে। প্রচুর বর্জ্য তোলার পরও আরো অনেক বর্জ্য রয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ এখনো ফিরে আসেনি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এখানে বেশ কয়েকবারই উচ্ছেদ ও খননকাজ করা হয়েছে। কিন্তু বড় স্থাপনাগুলো কখনো স্পর্শও করেনি কেউ। 

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে নব্বইয়ের দশকেও প্রবহমান ছিল। ১৯৮৭-৮৮ সালে সেখান থেকে নৌকায় পাড়ি দিয়ে অনেকেই টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায়ও যাতায়াত করেছেন। পরবর্তী সময়ে বেড়িবাঁধ হয়ে যাওয়ার পর বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল দখল শুরু হয়। এসব জায়গা দখল করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। অনেক দখলদার সে সময় তত্কালীন প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব জমির মালিকও বনে গিয়েছে। এখন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না।

পরিবেশকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, একটি নদীর নির্দিষ্ট গতিপথ আছে। হঠাৎ কোথাও খনন করলেই নদী সচল হয়ে যায় না। আদি চ্যানেলে যেসব অবৈধ স্থাপনা আছে সেগুলো উচ্ছেদ করা জরুরি। নয়তো কিছুদিন পর খনন করা অংশের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে আবার সেই আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।

আদি চ্যানেল খননের কাজটি ভালো উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন বলেছি, আন্দোলন করেছি, এর ফলে সিটি করপোরেশন এখন খননকাজ করছে। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আদি চ্যানেলের বড় অংশই সরকারি নানা সংস্থার দখলে রয়েছে। সেখানে সরকারি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজও রয়েছে। এসব দখল উচ্ছেদ যদি সম্ভব না হয় তাহলে ডিএসসিসির এ ভালো উদ্যোগ অল্পদিনেই মাঠে মারা যাবে।

প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছি। সিএস ম্যাপ অনুযায়ীই আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল উদ্ধার করা হবে। এজন্য আমাদের বেশকিছু সময় লাগবে। আপাতত আমরা নিজস্ব অর্থায়নে উচ্ছেদ করছি। তাই বড় আকারে উচ্ছেদ না করে স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করেছি। প্রকল্প পাস হলে বড় আকারে উচ্ছেদ করা হবে। তখন সবার স্থাপনাই উচ্ছেদ করা হবে। 

বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, আদি চ্যানেলসহ ঢাকার চারপাশে যখনই সরকারি সংস্থাগুলো উচ্ছেদ অভিযান করেছে, তখনই গরিব মানুষদের উচ্ছেদ করেছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবারই বেঁচে গিয়েছে বা বাঁচিয়ে দেয়া হচ্ছে। ঢাকার চারপাশের নদ-নদীতে এখনো বহু শিল্প-কারখানা দিব্যি কাজ করে যাচ্ছে। এ ধরনের লোক দেখানো উচ্ছেদ কার্যক্রমকে আমরা একপেশে ও দুর্বল সিদ্ধান্ত বলে মনে করি।

স্বল্প পরিসরে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে বলা হচ্ছে বড় আকারে উচ্ছেদ করতে হলে প্রকল্প লাগবে, অনেক টাকা লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু উচ্ছেদ করতে টাকা লাগবে কেন। উচ্ছেদ করতে লাগবে এক্সক্যাভেটর মেশিন, যা সিটি করপোরেশনের পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। এখন শুধু সদিচ্ছা দরকার, যা এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না।