বছরের প্রায় অর্ধেক সময় উপজেলার বেশির ভাগ গ্রাম পানির নিচে থাকে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা। খালিয়াজুরী হাওর দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। উপজেলার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র।
নেত্রকোনা জেলা সদর থেকে খালিয়াজুরীর যাতায়াত ব্যবস্থা একসময় ছিল খুবই খারাপ। বলা হতো বর্ষায় নাও (নৌকা) শুকনায় পাও (পা)। অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে ও বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া চলাচল করা যেত না। বর্ষা মৌসুমে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী হাওর অনেকটা সাগরে পরিণত হয়। তবে এখন শুকনো মৌসুমে মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনে চলাচল করা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে খালিয়াজুরীর হাওরে আফালের (ঢেউ) তাণ্ডবে বিলীন হচ্ছে অসংখ্য বাড়িঘর ও স্থাপনা। ফলে গৃহহীন হয়েছে হাজারো মানুষ।
জেলার গৃহহীন মানুষের কথা ভেবেই আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীনে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে গড়ে তোলা হয়েছে ‘আবাস স্থান’। নির্মিত প্রত্যেকটি ঘরই যেন ভূমি ও গৃহহীন মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা, নির্ভরতার স্থান। নতুন ঠিকানায় উঠে এসব ঘরের বাসিন্দারা নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ মনে করছে তাদের জীবন। তারা জীবন চলার পথে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।
খালিয়াজুরী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রামের ভূমি বছরের ছয়-সাত মাস ভূমি পানির নিচে থাকে। ভাটি বা হাওর এলাকায় শীতকালে দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে ফলে সোনালি ফসল বোরো ধান। আর বর্ষায় বিশাল হাওরে বছরের অধিকাংশ সময় পানিতে ঢেউ খেলে। বর্ষাকালে হাওরের গ্রামগুলোকে ছোট ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়। সেই গ্রামগুলোতে শোভা পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার ভূমিহীন-আশ্রয়হীনদের আবাসস্থল নানা রঙের সেমিপাকা ঘর।
খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীনে জেলার খালিয়াজুরী উপজেলায় দুই ধাপে ৮৪৩টি প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নে ১৬টি, চাকুয়ায় ১১, খালিয়াজুরী সদরে ১৯৬, নগরে ৪৮ ও কৃষ্ণপুর ইউনিয়নে ১৭২টি এবং দ্বিতীয় ধাপে মেন্দিপুরে ১০, চাকুয়ায় ৫০, খালিয়াজুরী সদরে ৬৬, নগরে ৭২, কৃষ্ণপুরে ১২ ও গাজীপুরে ১৯০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘরের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকল্পের বাসিন্দাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের মুজিবনগর ও মুমিননগর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, যারা ঘর পেয়েছে, তাদের আনন্দের যেন শেষ নেই। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা নিজের সীমানায় ঘরের আশপাশে লাগিয়েছে নানা জাতের ফুল ও ফল গাছের চারা। কেউ হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন শুরু করেছে। সেমিপাকা ঘর পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে তারা।
মুজিবনগরের হেলাল মিয়া গরু বেচাকেনার ব্যবসা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘর পেয়ে সেটিকে সুন্দর করে সাজিয়েছেন। ঘরের দেয়ালে এঁকেছেন আলপনা। তার স্ত্রী কোহিনূর বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, তাইন (স্বামী) গরু বেচাকেনা করে। যা আয় হয় কোনো রকমে চলে আমাদের সংসার। ঘর পেয়ে আমরা নিশ্চিন্ত হইছি।’ প্রকল্পের ঘর পাওয়া একই গ্রামের বাসিন্দা গফুর মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। কাজকাম করে আমাদের কোনো রকমে দিন চলে যেত। টিনের ছাপরা ঘরে থাকতাম, নিজের কোনো জায়গা ছিল না। প্রধানমন্ত্রী আমাদের থাকনের ব্যবস্থা করেছেন, আমরা খুব খুশি হইছি।’
খালিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সানোয়ারুজ্জামান সিদ্দিকী জোসেফ বলেন, মুজিবনগর গ্রামটি ছিল একটি অবহেলিত গ্রাম। এখানে বসবাসরত প্রতিটি পরিবার অসহায়। বেশির ভাগ গরীব খেটে খাওয়া মানুষ। এই মুজিব নগরে ৭৩টি পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার জমি ও নতুন ঘর দিয়ে পূর্নবাসিত করা হয়েছে। নতুন ঘরে তারা সুন্দর জীবন যাপন করছেন।
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উপহার ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে জমিসহ ঘর দেয়া হয়েছে। উপজেলায় দুই ধাপে ৮৪৩টি ঘরের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। প্রথম ধাপের ঘর নির্মাণে দু-চারটিতে সামান্য ত্রুটি ছিল। তা পরে ঠিক করে দেয়া হয়েছে। জমিসহ ঘরের কাগজপত্র উপকারভোগীদের বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। সেসব ঘরে তারা বসবাস শুরু করেছে।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ‘আর কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না’ লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। অবহেলিত জনপদ খালিয়াজুরীতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের বাসিন্দারা যাতে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পরে তার ব্যবস্থা করার জন্য চিন্তাভাবনা চলছে। স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে তাদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রকল্প এলাকায় মসজিদ, উপাসনালয়, খেলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি জমিতে শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল আবাদের জন্য জমি বরাদ্দ দেয়া হবে।










