চট্টগ্রামের কারচুপি ও জারদৌসির নকশা কাজের ঐতিহ্য ছিল বিশ্বজুড়ে।
বিদেশী পোশাকের অধিক্যের কারণে এ শিল্প হারিয়ে যেতে বসলেও দেশীয় বাজারের চাহিদার কারণে শিল্পটি কোনো রকমে টিকে ছিল।
তবে করোনা মহামারীর কারণে দেশীয় বাজার বন্ধ এবং সীমান্ত বন্ধ থাকাসহ নানা কারণে শিল্পটি প্রায় বন্ধের পথে।
মূলত চট্টগ্রামে শপিংমল এবং বুটিকসের দোকানে ক্রেতা না থাকায় ক্রমেই এ শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেকে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত কয়েক বছর ধরে ঈদকে কেন্দ্র করে এ শিল্পের কার্যক্রম চলত।
তাছাড়া কাজের নতুনত্ব না আসা এবং শিল্পে মেশিনারিজের ব্যবহার না করায় এ শিল্পের ঐতিহ্য হারিয়েছে অনেক আগেই।
তবে এ ব্যবসা কোনো রকম টিকিয়ে রাখা গেলেও করোনার কারণে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
সরেজমিন চট্টগ্রাম নগরীর ওয়্যারলেস এলাকায় বিহারী পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, করোনার কারণে বেশির ভাগ কারখানা বন্ধ।
দু-একটি খোলা থাকলেও সেখানে কাউকে কাজ করতে দেখা যায়নি।
মূলত কাঁচামাল না থাকার কারণে কোনো কাজ নেই।
যারা আছেন তারা সময় পেলে হাতেগোনা দু-একটি কাজ করেন।
কারিগররা জানান, চট্টগ্রামে কিছু কাজ পাওয়া গেলেও কাঁচামাল না থাকার কারণে সেগুলোও নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জরি, সুতা, পুঁতি, চুমকি, পাথর এসব কারচুপি এবং জারদৌসির মূল কাঁচামাল।
মূলত কারচুপি কিংবা জারদৌসির কাজের কাঁচামাল ভারত ও পাকিস্তান থেকে আনতে হয়।
করোনার কারণে সীমান্ত বন্ধ থাকায় কাঁচামাল নেই বললেই চলে।
কাজ না আসায় এখন এ শিল্প কারখানার মালিক, ব্যবসায়ী ও কারিগররা আর আগের মতো কাজ করেন না।
চট্টগ্রামের বিহারী পল্লীর চয়েস কারচুপি হাউজের মালিক মোহাম্মদ জালাল বণিক বার্তাকে বলেন, কারচুপি, জারদৌসি কিংবা শাড়ির ওপর কারুকাজ হাতের মাধ্যমে কেবল চট্টগ্রামেই করা হতো।
বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে কাজ শেখার জন্য কারিগররা আসতেন।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের ব্যবসা বড় করা সম্ভব হয়নি।
ঈদের সময় এ কাজের চাহিদা কিছুটা থাকার কারণে আমরা এক দশকে অনেকটা ধুঁকে ধুঁকে ব্যবসাটি টিকিয়ে রেখেছিলাম।
কিন্তু গত দুই বছর আমরা একেবারেই এ ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছি।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় হাউজের মালিক আরো জানান, চট্টগ্রামের শপিংমলগুলোতে আমাদের হাতে তৈরি কাপড়ের চাহিদা ছিল।
কিন্তু করোনার কারণে শপিংমল বন্ধ থাকায় আমরা অর্ডার পাচ্ছি না।
যার কারণে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমার কারিগররা রুটি-রুজির কারণে চলে গেছেন অন্য পেশায়।
আমাদের মতো মালিকদের কারখানা এখন একেবারেই ছোট করে ফেলতে হচ্ছে।
তবে বেশিদিন এভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।
কারচুপির কারিগর মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা বণিক বার্তাকে জানান, ২০১৪-১৫ সালের পরবর্তী সময়ে এ পেশায় মূলত ধস নামা শুরু করে।
ভারতীয় পোশাকের আধিক্য এবং অন্যান্য কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ শিল্প চলছে সীমিত পরিসরে।
তবে করোনার কারণে এ শিল্পের অবস্থা তলানিতে।
অর্ডার না থাকায় অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে গেছেন।
অনেক কারখানা মালিক এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।
তবে দু-একজন যারা আছেন তারা এখন পার্টটাইম এ কারিগরি পেশায় আছেন।
মূলত করোনার প্রভাবে এ ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এখন অন্ধকারে।
আমি নিজেও এখন কারচুপির সঙ্গে যুক্ত নেই।
কারচুপি ও জারদৌসির নকশা কাজের অভিজ্ঞ মো. রাশেদ বলেন, চট্টগ্রামের বিহারী পল্লীর কারিগররা কাপড়ের ওপরে কারচুপি এবং জারদৌসির কাজের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ ছিলেন। শুধু এ কাজ শেখার জন্য চট্টগ্রামে আসতেন ভারতের মুম্বাই, রাজস্থান, পাঞ্জাব, কেরেলা, কলকাতা, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কারিগর। চট্টগ্রামের এ শিল্পের কারিগরদের ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ সমাদরের চোখে দেখা হতো। তবে নতুন করে পেশায় বিনিয়োগ না হওয়া এবং কাপড়ের বাজার ভারতীয়দের দখলের চলে যাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের ৯০ শতাংশের বেশি কারখানা এখন বন্ধ। বিশেষ করে দুই বছরে করোনার কারণে এ শিল্পের অবস্থা আরো খারাপ।










