চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই একের পর এক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সিলেটের চা বাগানগুলো। লাগাতার অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও প্রচণ্ড দাবদাহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উৎপাদন। এর মধ্যে আবার ক্রমাগত লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে চা প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম। প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হওয়ায় চায়ের গুণগত মান ধরে রাখা নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। উৎপাদিত চায়ের যথাযথ মান ধরে রাখতে না পারলে তা রফতানির বাজারে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। কোনো কোনো বাগানের কারখানায় জেনারেটর দিয়ে প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম চালু রাখা হলেও তাতে ব্যয় হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা বাগানের ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, পানীয় পণ্যটির মৌসুম শুরু হয় মার্চ-এপ্রিলে। শেষ হয় নভেম্বর-ডিসেম্বরে। এর মধ্যে উৎপাদনের জন্য ভরা মৌসুম ধরা হয় জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসকে। এ সময় বাগানগুলোর ফ্যাক্টরিতে প্রক্রিয়াকরণের জন্য দৈনিক চা পাতা আসে ক্ষেত্রভেদে ৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার কেজি। প্রতিটি ব্যাচ প্রক্রিয়াজাতে সময় লাগে ১০-১২ ঘণ্টা। এজন্য এ সময় ২৪ ঘণ্টাই কারখানা চালু রাখতে হয়। কিন্তু এখন ক্রমাগত লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানা চালু রাখা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার জেনারেটর দিয়েও কারখানার সব মেশিন ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হয়ে নষ্ট হচ্ছে চায়ের গুণগত মান। উৎপাদিত চা হয়ে পড়ছে রফতানির অনুপযোগী।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে আসামে ব্রিটিশদের হাত ধরে উপমহাদেশে প্রথম চা চাষ শুরু হয়। ১৮৫৪ সালে সিলেটের বিমানবন্দর রোডের কাছে মালনীছড়া চা বাগানের কার্যক্রম শুরু করে ব্রিটিশরা। বাণিজ্যিকভাবে সফল এ মালনীছড়াই দেশের প্রথম চা বাগান হিসেবে স্বীকৃত।

বিদ্যুতের বর্তমান পরিস্থিতিতে এখানকার চা প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রমও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাগানের ব্যবস্থাপক মো. আজম আলী বলেন, বাগান থেকে চা পাতা চয়নের পর সাত-আট ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। প্রতি ধাপে ব্যবহার হয় আলাদা মেশিন। এসব মেশিনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকতে হয়। বাগান থেকে পাতা উত্তোলনের পর কাঁচা পাতা ফ্যান চালিয়ে একটানা ৬-৭ ঘণ্টা টার্ফে রাখতে হয়। তারপর মেশিনে তুলতে হয়। তখন মেশিন যদি ১ ঘণ্টা চলার পর বন্ধ হয়ে যায়; তাহলে পাতা মেশিনে আটকে নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি বা অতিরোদ—কোনোটিই চায়ের জন্য ভালো নয়। সিলেটে চলতি মৌসুমে বৃষ্টি ও রোদ দুটোই অতিরিক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে আবার শুরু হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বৃষ্টিভেজা চা পাতার সঠিক প্রক্রিয়াকরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাগানগুলোকে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত চা বাগান আছে মোট ১৬৭টি। এর মধ্যে শুধু সিলেট বিভাগেই আছে ১৩৫টি। এছাড়া চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড়েও বেশকিছু চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে চায়ের প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় খুব সতর্ক ও সচেতনভাবে। ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া এ প্রক্রিয়ায় সামান্য হেরফের ঘটলেই চায়ের গুণগত মান ঠিক থাকে না বলে জানালেন জাফলং চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. কামাল হোসাইন। তিনি বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর দিয়ে সবকিছু সঠিকভাবে করা যাচ্ছে না। এভাবে চা প্রক্রিয়াজাত করলে গুণগত মান নষ্ট হবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আলাদাভাবে চা বাগানে বিদ্যুৎ সচল রাখা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগ সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর কাদির। তিনি বলেন, চা বাগানের ফিডারগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। তাই আলাদাভাবে বাগানে বিদ্যুৎ সচল রাখা সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে লোডশেডিংয়ের সময় তাদের নিজস্ব জেনারেটর দিয়েই কাজ চালাতে হবে। এ লোডশেডিং ইচ্ছাকৃত নয়। সেটি আমাদের বুঝতে হবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে লোডশেডিংও কমে আসবে।

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও নর্থ সিলেট ভ্যালির চেয়ারম্যান নোমান হায়দার চৌধুরী বলেন, চা শিল্প এখন এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে লোডশেডিং চা শিল্পে বিপর্যয়ের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করলেও ঘোষিত সময় মানা হচ্ছে না। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে জেনারেটর চালু করতে সময় লাগছে। আবার বিদ্যুৎ এলে মেশিন নতুনভাবে চালু হতেও সময় লাগছে। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়া ঢিমেতালে হওয়ার পাশাপাশি প্রক্রিয়াকরণের ধারাবাহিকতায়ও ব্যাঘাত ঘটছে। এতে একদিকে সময়, অন্যদিকে চায়ের গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে। জেনারেটর চলে ডিজেলে। বাজারে ডিজেলের সংকট রয়েছে। এ কারণে জেনারেটর চালিয়েও উৎপাদন ঠিক রাখা যাচ্ছে না। চায়ের সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে মালিক-শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। চা প্রক্রিয়াকরণের এ ভরা মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।