প্রায় সাত লাখ মানুষের বসতি নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায়। দেশ যখন শতভাগ বিদ্যুতের পথে, তখন এ দ্বীপে মাত্র আড়াই হাজার গ্রাহকের ঘরে পৌঁছেছে জেনারেটরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ। তাও নিরবচ্ছিন্ন নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের আটটি জেনারেটরের ছয়টিই বেশির ভাগই সময় বিকল থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় গ্রাহকদের। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, জেনারেটরগুলো পুরনো হওয়ায় দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হয় না। এজন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত লাখ মানুষের এ জনপদে বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগে ১৯৬৪ সালে। শুরুতে একটি জেনারেটরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে চাহিদা মেটানো হতো। পর্যায়ক্রমে যুক্ত হয় আরো সাতটি জেনারেটর। কিন্তু তাতেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। আটটি জেনারেটরে দুই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা থাকলেও বেশির ভাগ সময় জেনারেটরগুলো বিকল থাকায় ৬০০ কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে যে কয়েকজন গ্রাহক বিদ্যুৎ পাচ্ছেন, তারাও নিরবচ্ছিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রায় চার হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দ্বীপের মাত্র আড়াই বর্গকিলোমিটার এলাকার আড়াই হাজার গ্রাহকের ঘরে বিদ্যুতের তার পৌঁছেছে। আবার আটটি জেনারেটরের মধ্যে বর্তমানে ছয়টিই বিকল থাকায় ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও নির্ধারিত এসব গ্রাহক বিদ্যুৎ পাচ্ছেন মাত্র ২ ঘণ্টা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) হাতিয়া আবাসিক প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেনারেটর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হাতিয়া উপজেলায় গ্রাহকদের মাঝে সরবরাহ করা হয়। এ কারণে আগে থেকে হাতিয়ায় সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা, আবার বেলা ৩টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত মোট ১৩ ঘণ্টা নিয়ম করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে ছয়টি জেনারেটর বিকল থাকায় ৩-৪ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
সূত্রটি আরো জানায়, হাতিয়ায় বর্তমানে বিদ্যুতের মোট গ্রাহক প্রায় আড়াই হাজার। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ১ হাজার ৭০০ জন। বাকি ৮০০ গ্রাহক বাণিজ্যিক। এসব গ্রাহকের মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় দুই মেগাওয়াট। তাদের বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়ার জন্য স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে জেনারেটর আছে আটটি। এর মধ্যে একটি জেনারেটর এক হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতার। বাকি সাতটি ৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার। বর্তমানে আটটি জেনারেটরের মধ্যে কেবল ৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি সচল রয়েছে। আর বাকি ছয়টিই অচল। এর মধ্যে ৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার পাঁচটি এবং এক হাজার কিলোওয়াটের জেনারেটর একটি। ৪০০ কিলোওয়াটের দুটি জেনারেটর দুই বছরের বেশি সময় ধরে অচল। এ অবস্থায় বিদ্যুতের উৎপাদন কমে বর্তমানে ৬০০-৭০০ কিলোওয়াটে নেমে এসেছে।
জানতে চাইলে বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কথা স্বীকার করেন বিউবোর হাতিয়া কার্যালয়ের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ৩১ অক্টোবর ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জেনারেটর অচল হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের বেশি সংকট দেখা দেয়। বর্তমানে আটটি জেনারেটরের মধ্যে ছয়টিই অচল রয়েছে। এর মধ্যে দুটি অচল দুই বছর ধরে। এ কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন নেমে এসেছে ৬০০-৭০০ কিলোওয়াটে।
প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, বর্তমানে যেটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তা দিয়ে উপজেলা পরিষদ ও হাসপাতালে কোনোভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অচল এক মেগাওয়াট ক্ষমতার একটিসহ কয়েকটি জেনারেটরের মেরামতকাজ চলছে। শিগগিরই বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আয়েশা ফেরদাউসও বিদ্যুৎ সংকটের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এরই মধ্যে একটি ডিজেল প্লান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ। নতুন এ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ হলে আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। এতে দ্বীপকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হবে।










