দেশের নাগরিকদের টেলিফোনে চিকিৎসা সেবা দিতে চালু রয়েছে সরকারি সেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’। করোনাকালে এ সেবা নিতে আসা ফোনকলের সংখ্যা আগের তুলনায় ব্যাপক হারে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বর্তমানে স্বাস্থ্য বাতায়নে গ্রাহকদের মোট কলের ৮০ শতাংশই করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসকসংক্রান্ত। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা (এমআইএস) বিভাগ ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ চালু করে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় থেকে সেবাটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সিনেসিস আইটি লিমিটেড নামে একটি মোবাইল স্বাস্থ্যসেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। এ সেবা নিতে হলে ১৬২৬৩ হেল্পলাইনে কল দিয়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ বা ব্যবস্থাপত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত ছয়টি সেবা দিচ্ছে বাতায়ন। এ সেবা ব্যবহার করে টেলিফোনের মাধ্যমেই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শের জন্য সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা, অ্যাম্বুলেন্সের তথ্য জানা, নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল-চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে যেকোনো তথ্য, দুর্ঘটনার তথ্য প্রদান, করোনা সম্পর্কিত তথ্য জানা ও সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে যেকোনো অভিযোগ জানানো যায়। 

সিনেসিস আইটি সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্য বাতায়ন চালুর পর থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত এখানে কল এসেছে দেড় কোটি। এর মধ্যে ১ কোটি কল আসে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর, যার মধ্যে ৮০ লাখেরও বেশি কলে করোনা সংক্রমণবিষয়ক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। 

স্বাস্থ্য বাতায়ন ব্যবহার করে করোনাকালে দিনে গড়ে ৪০ হাজার ব্যক্তিকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এ সময়ে যেসব রোগ বা উপসর্গের সেবা দেয়া হচ্ছে, তার শীর্ষ দশই করোনা সম্পর্কিত। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ ভাইরাসজনিত জ্বর, ১৫ শতাংশ করোনার উচ্চ ঝুঁকি, ১২ শতাংশ সাধারণ ঠাণ্ডা, ১০ শতাংশ সাধারণ দুর্বলতা, ৬ শতাংশ শুষ্ক কাঁশি, ৫ শতাংশ গলা ব্যথা, ৪ শতাংশ গ্যাস্ট্রিক আলসার সংক্রান্ত (পিইউডি), ৩ শতাংশ ডায়রিয়া, ২ শতাংশ হাঁপানি ও ১ শতাংশ দুশ্চিন্তা বা মানসিক অশান্তিবিষয়ক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন।

এক্ষেত্রে রোগীর কাছ থেকে রোগ বা উপসর্গ সম্পর্কে জানার পর চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য বাতায়নের সিআরএম ফরমে সব তথ্য লিপিবদ্ধ রাখেন। কোনো ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিতে হলে ওষুধের নাম রোগীকে এসএমএস করে দেয়া হয়। প্রয়োজনবোধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গেও সংযুক্ত করে দেয়া হয়। এরপর সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তা রোগীকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। 

স্বাস্থ্য বাতায়নের সরকারি ওয়েবসাইট ও সিনেসিস আইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এ সেবা নিতে মোট কল এসেছিল যথাক্রমে ৭৪ হাজার ও ৭৫ হাজার। কিন্তু মার্চে মহামারীর সংক্রমণ শুরুর পর তা বাড়তে থাকে। অক্টোবর পর্যন্ত গত নয় মাসে এখানে কল এসেছে মোট ১ কোটি ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৬৭টি। এর মধ্যে ৮০ লাখেরও বেশি কলের করোনাসংক্রান্ত চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। এছাড়া এ সময়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যাও বেড়েছে।

এছাড়া আগের চার বছর স্বাস্থ্য বাতায়নে গ্রাহকদের অভিযোগসংক্রান্ত কল ওঠানামা করত ৪০০ থেকে দেড় হাজারের মধ্যে। করোনাকালে এ সংখ্যায় ব্যাপক উল্লম্ফন দেখা দেয়। চলতি বছরের মার্চেই এ অভিযোগের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯ হাজার ৭৬০টিতে। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এখানে মোট অভিযোগসংক্রান্ত কল এসেছে ২ লাখ ৯৭ হাজার ২১৩টি।

সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, অভিযোগ গ্রহণের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীকে বিষয়টি অবহিত করবে। যদিও অভিযোগকারীকে বিষয়টি অবহিত করা হয় না। বিষয়টি স্বীকার করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগও জানিয়েছে কিছু অভিযোগের সুরাহা করা গেলেও বেশির ভাগ অভিযোগের সমাধান করা হয় না। এছাড়া অভিযোগ সমাধানের কোনো স্পষ্ট পরিসংখ্যানও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) ডা. মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রকে অবহিত করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্তকেও জানানো হয়। তবে যন্ত্রাংশের স্বল্পতার যে অভিযোগ, তা দ্রুত সমাধানযোগ্য নয়। 

তিনি বলেন, করোনাকালে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সঙ্গে অভিযোগ বেড়েছে। সেবা বাড়লে অভিযোগের সংখ্যা একটু বাড়তেই পারে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগকারীকে পরে সঠিকভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। যতটুকু সম্ভব আমরা সমাধানের চেষ্টা করি।