দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১২টি জেলার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের নয়টি জেলার সড়কপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম লালন শাহ সেতু। বিকল্প কোনো সড়কপথ না থাকায় যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে ১০০-২০০ কিলোমিটার পথ পর্যন্ত বেশি অতিক্রম করতে হয় এ ২১ জেলার বাসিন্দাদের। সড়কপথের দূরত্ব ও যাত্রী ভোগান্তি কমাতে পাবনা-রাজবাড়ী নৌ রুটে রো রো ফেরি চালু করতে চায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো হলো পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো হলো পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়।

জানা গিয়েছে, ১৯৯৫ সাল থেকে পাবনার নাজিরগঞ্জ ও রাজবাড়ীর ধাওয়াপাড়া (জৌকুড়া-নাজিরগঞ্জ) নৌ রুটে দুটি ইউটিলিটি ফেরি চলাচল করে। জৌকুড়া দেশের একমাত্র ফেরিঘাট যার অভিভাবক সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ।

রাজবাড়ীর সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের নৌ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এ নৌ রুট। মূলত বর্ষা মৌসুমেই জৌকুড়া ফেরিঘাট থেকে ফেরি চলাচল সচল থাকে। সে সময় প্রতিদিন সাধারণত তিনবার ফেরি ছেড়ে যায়। একইভাবে অপরপ্রান্ত থেকেও তিনবার ছেড়ে আসে। ইউটিলিটি ফেরি ছাড়াও দুটি লঞ্চ ও কয়েকটি ট্রলার এ নদীপথে যাতায়াত করে।

মূলত সওজ বিভাগের সক্ষমতার অভাব ও নদীতে নাব্য সংকটের কারণে বছরের নয় মাসই এ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। নিজস্ব ড্রেজার না থাকায় চর খননও সম্ভব হয় না। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর চলতি বর্ষা মৌসুমে ফেরি চলাচল চালু হয়েছিল। তবে গত প্রায় এক সপ্তাহ নাব্য সংকটের কারণে ফেরি চলাচল আবারো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সে হিসেবে এক ধরনের অব্যবহূতই বলা চলে নৌপথটিকে।

রাজবাড়ী সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নওয়াজিস রহমান বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, পদ্মা নদীর পানি সম্প্রতি কমে গিয়েছে। এ কারণে ফেরিঘাটে ভিড়তে অসুবিধা হয়। ফলে ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সাময়িকভাবে ফেরি চলাচল বন্ধের বিষয়ে রাজবাড়ী সড়ক বিভাগ আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে।

২০১৬-১৭ সালে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে এ নৌ রুটে ফেরি চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এরপর নিকটবর্তী আরিচা নদীবন্দর থেকে বিআইডব্লিউটিসির মাধ্যমে রো রো ফেরি পরিচালনার সুপারিশ করা হয়।

বিআইডব্লিউটিসি জানিয়েছে, এতদিন ফেরি সংকটের কারণে জৌকুড়া-নাজিরগঞ্জ নৌ রুটে ফেরি সার্ভিস শুরু করা যায়নি। তবে পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মাওয়া নৌ রুটে ফেরির চাপ কমেছে। ফলে সেখান থেকে ফেরি কমিয়ে নিলে অসুবিধা হবে না। সম্প্রতি নৌ মন্ত্রণালয়ে জৌকুড়া-নাজিরগঞ্জ ফেরি চালু-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসির একাধিক কর্মকর্তা সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশ করেছেন। সুপারিশমালায় বলা হয়েছে, ওই রুটে বর্তমানে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া ইউটিলিটি ফেরি পারাপারে অনেক বেশি সময় লাগে। ছয় কিলোমিটার নৌ রুট পাড়ি দিতে ইউটিলিটি ফেরির দেড় ঘণ্টা লেগে যায়। কিন্তু একই পথ রো রো ফেরির পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৩০-৪০ মিনিট। সময় বাঁচার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের সড়কের ক্ষয়ক্ষতি কমবে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

কবে নাগাদ ফেরি চালু হবে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্যিক বিভাগ) শেখ মু. নাসিম বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা খুব শিগগির জৌকুড়া-নাজিরগঞ্জ নৌ রুটে ফেরি চালু করতে যাচ্ছি। তবে নির্দিষ্ট করে কোনো দিন-তারিখ এখনো বলা যাচ্ছে না।

রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আবু কায়সার খান বণিক বার্তাকে বলেন, জৌকুড়া নাজিরগঞ্জ নৌ রুট ব্যবহার করে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করা সম্ভব। নৌ রুটটি চালু হলে সাত-আট জেলার মানুষের উপকার হয়। তারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবেন। পর্যাপ্ত সক্ষমতা বাড়ানো হলে এ ঘাট পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

 

এ প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার রাজবাড়ী প্রতিনিধি