সিলেটে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সিলেটের একমাত্র করোনা চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এ অবস্থায় করোনা চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবহার করতে চাইছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অথচ সিলেটে সংক্রামক ব্যাধি চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল থাকলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি না থাকা এবং লোকবল সংকটে এ হাসপাতাল করোনা মোকাবেলায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ওই সময়ে এর নাম ছিল কলেরা হাসপাতাল। সিলেট নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় ১০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ২০টি। পরে এটিকে ‘সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। প্রথমে হাসপাতালটি সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদারকিতে পরিচালিত হতো। তবে বর্তমানে এটি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও সিলেটের সিভিল সার্জনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

৫৮ বছর আগে যাত্রা শুরু করা এ হাসপাতালটির শয্যার সংখ্যা না বাড়লেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ভূমি অধিগ্রহণের কারণে কমেছে জায়গার পরিমাণ। প্রতিষ্ঠার সময় জায়গার পরিমাণ ১০ একর থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ একর ৭ শতকে। হাসপাতালের চার শতক জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে সদর উপজেলা খেলার মাঠ, যা এখন শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম। এছাড়া সংক্রামক হাসপাতাল হলেও চারপাশে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য স্থাপনা। কয়েক মাস আগে হাসপাতালটিতে যুক্ত হয়েছ একটি অ্যাম্বুলেন্স। এই অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া এখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের তেমন কোনো যন্ত্রপাতি নেই। এমনকি নেই   কোনো এক্স-রে মেশিন। রয়েছে তীব্র জনবল সংকটও।

সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ হাসপাতালটিতে মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা ৪৫টি। তবে মঞ্জুরীকৃত পদের ৬৩ শতাংশই শূন্য রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে দুই চিকিৎসকসহ কর্মরত মাত্র ১৭ জন। একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, দুজন মেডিকেল অফিসার ও একজন প্যাথলজিস্ট থাকার কথা থাকলেও কেবল মেডিকেল অফিসার পদে দুজন চিকিৎসক কর্মরত। জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদে একজন গাইনি চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও তিনি বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালটিতে তিনটি মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ থাকলেও সবই খালি। একইভাবে খালি রয়েছে স্টুয়ার্ডের পদ। হাসপাতালে পাঁচটি সিনিয়র স্টাফ নার্স পদে পাঁচজন কর্মরত থাকলেও সহকারী স্টাফ নার্সের চারটি পদের তিনটিই খালি। জনবল সংকট রয়েছে প্রশাসনিক পদেও। হাসপাতালটির প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মঞ্জুরীকৃত সাতটি পদের বিপরীতে ছয়টিই শূন্য রয়েছে। একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও ছয়জন অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) থাকার কথা থাকলেও শুধু একজন অফিস সহায়ক দিয়ে চালানো হচ্ছে গোটা হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে এখানে ডায়রিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, জলবসন্ত, জলাতঙ্ক, টিটিনাস, হাম, মামস-জাতীয় রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য এখানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নেই।

সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. এহসানুন জামান খান বলেন, হাসপাতালটির প্রধান সমস্যা হচ্ছে জনবল ঘাটতি। একটি কনসালট্যান্ট পদ থাকলেও সেটি খালি রয়েছে। এছাড়া নেই রোগ নির্ণয়ের বা পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধা। হাসপাতালে চারটি অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও নেই সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, এ হাসপাতালটিতে আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন প্রতিস্থাপন জরুরি হলেও এ ব্যাপারে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক হিমাংশু লাল রায় বলেন, সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে দ্বৈত তদারকির কারণে জনবল থেকে শুরু করে কোনো ব্যাপারে তেমন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তার পরও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি একটি অ্যাম্বুলেন্স ও চালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমি সিভিল সার্জন থাকাকালীন এ ব্যাপারটা নিয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছি এবং দু-তিনবার চিঠি দিয়েছি। বর্তমানে পরিস্থিতিতে এ হাসপাতালের প্রয়োজনীয় উন্নয়নে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে দ্রুতই এটি একক প্রশাসনের আওতায় চলে আসবে। তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণও সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, প্রথমে আমরা সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ও লোকবল না থাকায় এটি এখন ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।