সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, সিভিল সার্ভিসের রাজনীতিকরণের একটি বড় নেতিবাচক ফলাফল হলো, এটি বাস্তবে সংস্কারকে থামিয়ে দেয়। আমরা দেখেছি কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ‘এলিট ক্যাপচার‘ বিষয়টিও সংস্কারের পথে বাধা হিসেবে কাজ করে।
আজ রোববার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে মূল বক্তার আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মেলনের তৃতীয় দিনের ‘রোমান্সিং দ্য রিফর্ম: দ্য বাংলাদেশ স্টোরি’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিপিডির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। এতে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। অধিবেশনের সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সম্প্রতি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্বাচনী অনিয়মের কারণে একটি ‘ক্লেপ্টোক্র্যাটিক’ কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তিনি সংস্কারের প্রধান বাধা হিসেবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব, সুরক্ষাবাদ, আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ এবং এলিট ক্যাপচারকে চিহ্নিত করেন, যেখানে রাষ্ট্র কখনো নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে এবং সেগুলো বন্ধ বা একীভূত করা একটি কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অতীতে ব্যাংকিং আইনে শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন সংস্কারকে দুর্বল করেছে এবং একই প্রবণতা পুনরায় দেখা গেছে।
তার মতে, অর্থনৈতিক সংস্কার কোনো এককালীন বিষয় নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়—রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, পরবর্তীতে বেসরকারিকরণ, বাজার উদারীকরণ, ভ্যাট চালু ও ভাসমান বিনিময় হার চালুর মতো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও ডিজিটালাইজেশনও উল্লেখযোগ্য সংস্কার। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার রাজনৈতিক সংস্কার ইস্যুতে ঢাকা পড়ে যায়।
সংস্কার প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ‘সংকট তত্ত্বের’ কথা উল্লেখ করে বলেন, গুরুতর সংকট সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে, যদিও এটি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পাশাপাশি স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধ, ‘ওয়্যার অফ এট্রিশন’ ধরনের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কৌশলগত ভূমিকা—এসব একসঙ্গে কাজ করে কখনও সংস্কার বিলম্বিত, আবার কখনও ত্বরান্বিত করে। পরিকল্পনা করা তুলনামূলক সহজ হলেও বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক সংস্কার একটি জটিল ও প্রেক্ষাপটনির্ভর প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেখানে ভালোবাসা, হতাশা ও রোমাঞ্চ—সব মিলিয়েই এক ধরনের ‘রোমান্স’ তৈরি হয়। তার মতে, এটি একধরনের ধাঁধা এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্ব নেই—সবকিছুই নির্ভর করে বাস্তব প্রেক্ষাপটের ওপর। আগের অভিজ্ঞতাও অনেক সময় কাজে আসে না। তাই ঐকমত্যের ভিত্তিতে শক্ত অবস্থান, বাস্তবায়নযোগ্য ও সুস্পষ্ট সমাধান এবং ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি; পাশাপাশি সহযোগিতা ও সমন্বিত পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, দেশে সংস্কার নিয়ে আলোচনায় মূল চ্যালেঞ্জ আইন প্রণয়ন নয়, বরং বাস্তবায়ন; কারণ মাঠপর্যায়ে ফলাফলই সংস্কারের প্রকৃত মাপকাঠি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কারের মতো উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে তা ২ বছর পর বা বর্তমান সময়েই যাচাই করা সম্ভব। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শর্তাধীন অনেক সংস্কারই পুরনো, যা সাইফুর রহমানের সময় থেকে পুনরাবৃত্ত হচ্ছে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়ার জন্য এক ধরনের প্রক্রিয়াগত ‘খেলা’ চলে, যেখানে উভয় পক্ষের অর্থ ছাড়ের স্বার্থ কাজ করে।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯০ এর দশকে বিচার বিভাগ ও বাজেট সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও তার ফলাফল মূল্যায়ন হয়নি এবং বর্তমানে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া দেখা যাচ্ছে। একইভাবে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট একীভূত করার প্রস্তাব ১৯৯০-এর দশক এমনকি পাকিস্তান আমল থেকেই থাকলেও ২০২৬ সালেও তা বাস্তবায়িত হয়নি, যা অদক্ষতা তৈরি করছে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান পারফরম্যান্স বাজেটিং চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৯৭০-৮০ দশক থেকেই এটি চালু থাকলেও বাংলাদেশে এখনো তা হয়নি, ফলে ব্যয়ের ফলাফল মূল্যায়ন করা যায় না।
তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ৫-৬ শতাংশ ব্যয়ের কথা বলা হলেও বরাদ্দকৃত ২ শতাংশও যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না এবং এর পেছনে কার্যকর বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে। এসব সমস্যাকে তিনি সংস্কারের নয়, বরং বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রকৃত সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে শক্তিশালী নেতৃত্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং আন্দোলন দরকার, যেমনটি ছয় দফা কর্মসূচির ক্ষেত্রে হয়েছিল।
সর্বশেষ তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে ২০০১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারই একমাত্র সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে এবং যতদিন না এ জবাবদিহিতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়, ততদিন সংস্কার বাস্তবায়নে সমস্যা থেকেই যাবে।
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, দেশে সংস্কারের পথে অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ ও তাদের বিবেচনামূলক ক্ষমতা। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে সংস্কার উদ্যোগগুলো অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছে মূলত আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধের কারণে, কারণ তারা নিজেদের ক্ষমতা হারাতে চায় না। তবে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটি শক্তিশালী সরকার থাকায়, যদি সিস্টেমকে স্পষ্ট সংকেত দেয়া যায়, তাহলে আমলাতন্ত্র বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
তিনি বলেন, আমলাতন্ত্র তখনই রাজনীতিকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়, যখন তারা কোনো ‘সুযোগের টানেল’ দেখতে পায়; তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান এবং বলেন, ডিজিটাল ও এআই ব্যবহারে আরো অনেক কাজ কমানো সম্ভব।
ব্যাংকিং খাত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ৪-৫টি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে ১-২টিতে রূপান্তর, সম্পদের মান যাচাই এবং ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করে পরে পাবলিক লিস্টিংয়ে আনা উচিৎ। যেসব ব্যাংকের নেটওয়ার্থ নেতিবাচক হয়ে গেছে, সেগুলো বন্ধ করা বা সংখ্যা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। শেষে সিভিল সার্ভিস সংস্কারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের জন্য আলাদা কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।










