বৈদ্যুতিক কেবল শিল্প এখন শুধু অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তার সঙ্গেই নয়, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ প্রবাহের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশে এরই মধ্যে অনেকগুলো কেবল কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও নতুনভাবে এ খাতে বিনিয়োগ করেছে আকিজ বশির গ্রুপ। বৈদ্যুতিক কেবলের উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার কৌশল, রফতানি সম্ভাবনাসহ সামগ্রিকভাবে কেবল শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন আকিজ বশির গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম

আকিজ বশির গ্রুপ বৈদ্যুতিক কেবল খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশে এ খাতের যাত্রা এবং বিকাশ পর্ব নিয়ে আপনার কাছে শুনতে চাই।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক কেবলের বাজার বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার। এ চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ পূরণ করেন স্থানীয় উৎপাদকরাই। আমাদের দেশে ডোমেস্টিক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং হাই-টেনশন—সব ধরনের কেবলই এখন উৎপাদিত হচ্ছে। যদিও কিছু বিশেষ কেবল আমদানি করতে হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমরা শতভাগ কেবল দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করব এবং রফতানির সুযোগও তৈরি হবে। কেবলের স্থানীয় উৎপাদন মূলত পাকিস্তান আমল বা দেশভাগের পর থেকেই শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১২০টির বেশি কোম্পানি থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে ৮ থেকে ১০টি ব্র্যান্ড মূল ভূমিকা পালন করছে।

স্থানীয় উৎপাদনের শুরুটা কীভাবে হয় এবং এ খাতের বড় পরিবর্তনগুলো কীভাবে এসেছে?

দেশে কুষ্টিয়ায় অবস্থিত একটি কোম্পানির মাধ্যমে এ খাতের বিকাশ শুরু হয়। তারাই প্রথম আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করার সাহস দেখিয়েছিল এবং এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল। এ ব্যবসায় তাদের ৫০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে মূলত নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে শিল্পায়ন শুরু হলে এ ধরনের টেকনিক্যাল পণ্যের চাহিদা বাড়ে এবং ২০০০ সালের দিকে এটি একটি বৃহৎ স্কেলের খাতে পরিণত হয়।

আকিজ বশির গ্রুপ কেন এখন এ খাতে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিল?

এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ। আমাদের গ্রুপের বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ডিভিশনে কন্ট্রিবিউশন প্রায় ৬০ শতাংশ। সিরামিক, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, বোর্ড, গ্লাস এবং অ্যালুমিনিয়ামের পর আমরা চেয়েছি গ্রাহক যেন তার ভবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব পণ্য আকিজ বশির থেকেই পেতে পারেন। দ্বিতীয় কারণ বাজারে ঘাটতি। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু উৎপাদকের একচেটিয়া মনোভাব এবং সরবরাহের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারায় বাজারে একটি আস্থার সংকট রয়েছে। গ্রাহকরা একটি নির্ভরযোগ্য উৎস খুঁজছেন। আর তৃতীয় কারণ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা। বাংলাদেশের কনস্ট্রাকশন খাতে আগামী বছরগুলোতে ভালো গ্রোথ পটেনশিয়াল বা প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে কি কোনো গ্যাপ বা অসংগতি রয়েছে?

বর্তমানে কনজাম্পশন বা চাহিদা ১২ হাজার কোটি টাকার হলেও দেশের কোম্পানিগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। অর্থাৎ সক্ষমতা বেশি থাকলেও সরবরাহে বড় সমস্যা আছে। অনেক সময় কাঁচামালের অভাব বা এলসি সমস্যার কারণে কোম্পানিগুলো সময়মতো পণ্য দিতে পারে না। এছাড়া বড় কিছু কোম্পানি বাজারকে ডমিনেট বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, যা নিয়ে চ্যানেল পার্টনারদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। আমরা কনসিস্টেন্ট বা ধারাবাহিক সরবরাহ এবং পার্টনারদের সঙ্গে সঠিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এ গ্যাপ পূরণ করতে চাই।

অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এবং বৈদ্যুতিক কেবলের মান নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন থাকে। আপনারা কীভাবে গুণগত মান নিশ্চিত করছেন?

আসলে অগ্নিকাণ্ডের জন্য তার বা কেবল দায়ী নয়, দায়ী হলো এর মান। আর মান মূলত নির্ভর করে সঠিক কাঁচামাল বা কপারের বিশুদ্ধতার ওপর। ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ পিওরিটির কপারের দাম যদি ১২০০ ডলার হয়, তবে ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ পিওরিটির কপার ৮০০ ডলারে পাওয়া যায়। অনেক প্রস্তুতকারক সঠিক স্পেসিফিকেশন মেনে চলেন না। কেবলের জন্য সঠিক উপাদানের কপার ব্যবহার করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমরা শতভাগ ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ পিওরিটির কপার ব্যবহার নিশ্চিত করছি। এছাড়া আমরা বাংলাদেশে প্রথম ও একমাত্র থ্রি লেয়ার ইনসুলেটেড কেবল নিয়ে এসেছি, যেখানে অন্যরা টু লেয়ার দিচ্ছে। আমাদের কেবল ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, যা বাজারে বিদ্যমান অন্য যেকোনো তারের চেয়ে অধিক নিরাপত্তা দেবে। এ কারণে মনে করছি আমরা বাজারে ভালো সাড়া পাব।

আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ নিয়ে কী ভাবছেন?

আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কেবল শিল্পে আমরা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমাদের লক্ষ্য আগামী তিন বছরের মধ্যে কেবল ছাড়াও ইলেকট্রনিক পোর্টফোলিওতে ফ্যান, সুইচ-সকেট এবং লাইট যুক্ত করা। যেহেতু এ পণ্যগুলো একই চ্যানেলে বা একই দোকানে বিক্রি হয়, তাই আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন ও সেলস খরচ কমবে।

বড় করপোরেটদের এ খাতে আসা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

এ খাতে ১২০টির বেশি কোম্পানি থাকলেও বড় করপোরেটরা এখনো সেভাবে নজর দেয়নি। তবে আমি বিশ্বাস করি শিগগিরই অনেক বড় হাউজ এ ইন্ডাস্ট্রিতে আসবে। যখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করে, তখন ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন হয় এবং ভোক্তারা সুবিধা পায়। তবে অতিরিক্ত সাপ্লাই হলে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়। আমরা এ খাতের মনোপলি বা একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে আমাদের শেয়ার নিশ্চিত করতে চাই এবং সময়ের সঙ্গে মার্কেট লিডার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চাই।

রফতানির সম্ভাবনা এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন কি কোনো প্রভাব ফেলবে?

বর্তমানে আমাদের ফোকাস স্থানীয় বাজারে হলেও ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে রফতানির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু এ খাতটি বর্তমানে বড় আকারে রফতানিনির্ভর নয়, তাই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ফলে রফতানি সুবিধা কিছুটা কমলেও কেবল ইন্ডাস্ট্রিতে খুব বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

নকল পণ্য রোধে এবং সঠিক পণ্য চেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

কেবল দেয়ালের ভেতরে থাকে বলে এর মান বাইরে থেকে বোঝা যায় না। নকল পণ্য রোধে প্রস্তুতকারক, বিক্রেতা, ভোক্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রস্তুতকারক হিসেবে আমরা আমাদের পণ্যে এমন টেকনিক্যাল ফিচার যুক্ত করছি, যা সহজে নকল করা যাবে না। গ্রাহকদের প্রতি পরামর্শ হলো কেবল কেনার সময় থ্রি লেয়ার ইনসুলেশন এবং ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহনশীলতা যাচাই করে বিশ্বস্ত দোকান থেকে ব্র্যান্ড দেখে পণ্য কিনবেন।