কয়েক বছর আগেও ড্রাগন ফল সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের তেমন ধারণা ছিল না। বিদেশী ফল হিসেবেই এটি পরিচিত ছিল। স্বল্প পরিসরে কিছু সুপারশপে মাঝে মাঝে দেখা মিলত এ ফলটির। তখন দামও ছিল বেশ চড়া। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সুপারশপ থেকে শুরু করে ছোট-বড় বাজার, গলির মুখের ফলের দোকান এমনকি ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের কাছেও মিলছে সুস্বাদু ড্রাগন ফল। অন্যান্য ফল চাষের চেয়ে লাভজনক হওয়ায় ধীরে ধীরে কৃষকরা ঝুঁকেছেন ড্রাগন চাষের দিকে। উদ্যোগী হয়েছে সরকারও। মানসম্মত উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু হয়। ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। দেশে গত ছয় বছরে ড্রাগন ফলের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩১ গুণ। অথচ ২০১০ সালের দিকে ব্যক্তি উদ্যোগে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে কিছু চারা এনে বাংলাদেশে ফলটির চাষ শুরু হয়েছিল।

গত ছয় অর্থবছরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মাত্র ৩৮ হেক্টর জমিতে ২৭৭ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হতো। এরপর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাষ হয়েছে ৫৪ হেক্টর জমিতে। সে বছর উৎপাদন হয় ৪৩১ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০৮ হেক্টর জমিতে ৮১৫ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২২৭ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৮০২ টন উৎপাদন হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৪১ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ৪৬৪ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৯৫ হেক্টর জমিতে ৮ হাজার ৬৫৯ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়।

অর্থাৎ ছয় বছরে প্রায় ৩১ গুণেরও বেশি ফল উৎপাদন বেড়েছে। গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে ঝিনাইদহ জেলায়। মোট ১৫১ হেক্টর জমিতে জেলাটিতে ৩ হাজার ৩৫৩ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়েছে, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৯ শতাংশ। এছাড়া যশোর জেলায় উৎপাদন হয়েছে ৫১ হেক্টর জমিতে ৯৬৫ টন। নাটোর জেলায় ৪০ হেক্টর জমিতে ৬৪০ টন, চট্টগ্রাম জেলায় ৫৫ হেক্টর জমিতে ৪১৮ টন ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় ১৭ হেক্টর জমিতে ৩৯৫ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ৬৫ হেক্টর জমিতে ৩৪৮ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সাধারণত বাউ ড্রাগন-১, বাউ ড্রাগন-২, বারি ড্রাগন-১, পিংক ড্রাগন, ভেলভেট ড্রাগন ও ইয়োলো ড্রাগন ফলের চাষ হয়ে থাকে। বাউ ড্রাগন-১-এর ভেতরের অংশ সাদা আর ওপরের অংশ লাল রঙের হয়ে থাকে। বাউ ড্রাগন-২ ও বারি ড্রাগন-১-এর বাইরে ও ভেতরে লাল। গোলাপি ড্রাগনের ভেতরে ও বাইরে গোলাপি। ভেলভেট ড্রাগনের ভেতরে ও বাইরে গাঢ় লাল হয় এবং হলুদ ড্রাগনের ভেতরে সাদা আর বাইরে হলুদ।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় গোলাপি ড্রাগন ও বাউ ড্রাগন-২। ভেলভেট জাতের ড্রাগনের দাম বেশি হওয়ায় এর চাষাবাদ এখনো প্রসারিত হয়নি। বাংলাদেশে এসব ড্রাগন ফল ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে এসেছে। ড্রাগন ফলে প্রচুর পটাশিয়াম, জিংক, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন বি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স রয়েছে। এছাড়া এর বীজে ওমেগা-৩, ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধী। এটা শরীরের দূষিত পদার্থ বের করে দিতে সহযোগিতা করে।

ড্রাগন ফল দুই পদ্ধতিতে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে খুঁটি পদ্ধতি। প্রতি খুঁটিতে চারটি করে গাছ লাগানো হয়। আরেকটি হলো আল্ট্রা হাইডেনসিটি ড্রাগন বা উচ্চ ঘনত্ব পদ্ধতি। ড্রাগন ফল উঁচু বা পাহাড়ি জমিতে চাষ করতে হয়। কারণ পানি জমে থাকা জমিতে ড্রাগন চাষ করা যায় না।

বিভিন্ন জেলার স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছরের এপ্রিল থেকে ড্রাগন গাছে ফুল আসা শুরু হয়। অক্টোবর পর্যন্ত ফুল আসে। আর মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ফল কাটা হয়। শীতের সময়ে সাধারণত ড্রাগন গাছে ফল হয় না। সাধারণত প্রতি শতক জমিতে সাতটি পিলার থাকে। প্রতি পিলার থেকে বছরে গড়ে ১২ থেকে ২০ কেজি ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়। প্রতি পিলারে চারটি করে গাছ থাকে। এছাড়া প্রতি বছর সাত-আটটি ধাপে ড্রাগন ফল বিক্রি করেন কৃষকরা। সিজনের প্রথমদিকে ১৫০-২০০ টাকা দাম থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শেষ দিকে প্রতি কেজি ৩৫০-৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

২০১৪ সাল থেকে প্রায় ১০ একর জমিতে ড্রাগন চাষ করছেন নাটোরের গোলাম নবী। তিনি জানান, তার জমিতে লাল, সাদা ও গোলাপি—এ তিন জাতের ড্রাগন চাষ করা হয়। হলুদ জাতের চাহিদা কম হওয়ায় সেটির চাষ করেননি। এসব জমিতে প্রায় পাঁচ হাজার খুঁটি রয়েছে। এখন পর্যন্ত উৎপাদন ভালো হচ্ছে, ব্যবসায়ও লাভ হচ্ছে। তবে গাছে অনেক সময় রোগ-বালাই হয়, সেগুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়।

রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় প্রায় এক একর জমিতে ড্রাগন চাষ করেন শামছুল আলম। প্রতি বছর গড়ে ৬ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করেন তিনি। সব খরচ বাদ দিয়ে আয় হয় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, পাহাড়ি জমির ড্রাগন সমতলের তুলনায় মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়। নিচু এলাকা স্যাঁতসেঁতে হওয়ার কারণে সাইজে বড় হলেও স্বাদ কম থাকে। এবার ৬-৭ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তিনি।

শামছুল আলম জানালেন, শুরুতে ফলের দাম বেশি ছিল। এখন উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম তুলনামূলক কম পাচ্ছেন তারা।

দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া জেলা ঝিনাইদহ সদরে ড্রাগন চাষ করেন আবদুল মান্নান। তিনি দেড় একর জমিতে চাষ করে প্রতি বছর প্রায় ১০-১২ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করেন। আয় হয় ৭ লাখ টাকার মতো।

মূলত লাল জাতের ড্রাগন চাষ করেন আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, থাইল্যান্ডের এ জাতের চাষ করছেন ২০১৭ সাল থেকে। এক একর জমি দিয়ে চাষ শুরু করেছিলেন, পরে তা বাড়িয়েছেন। ড্রাগন চাষ ব্যয়বহুল। খুঁটি দেয়াসহ প্রথম বছর অনেক টাকা খরচ হয়। এ কারণে অনেকেই চাষ করতে চান না। অর্থাৎ শুরুতেই অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। তবে ড্রাগন চাষ করে প্রত্যাশা অনুযায়ী ভালো আয় হচ্ছে। এলাকায় অনেকেই এখন ড্রাগন চাষ করছেন। এ ফল চাষে তেমন কোনো ঝুঁকি না থাকলেও ঝড়ের কারণে মাঝেমধ্যে ক্ষতি হয়। পানি জমে থাকলে সব গাছ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে তুলনামূলক উঁচু জায়গায় চাষ করতে হয়।

বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে ড্রাগন ফলের চারা এসেছে। আমরা ২০১০ সালে ভিয়েতনাম গেলে সেখান থেকে চারা নিয়ে আসি। অন্য অনেকে আগেও এনেছে। তবে প্রকল্পের আওতায় এনে সর্বপ্রথম ড্রাগন ফলের চাষ করা শুরু করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ড্রাগন ফল অন্যান্য ফলের চেয়ে লাভজনক। পাহাড়ি এলাকায় ড্রাগন ফল ভীষণ সম্ভাবনাময় একটি ফল।

ধান চাষের জমিতে ড্রাগন চাষ করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ফল সাধারণত পাহাড়ি এলাকার ফল। নিচু জমিতে ড্রাগন চাষ করা যায় না। উঁচু জমি হতে হবে। যেখানে পানি জমে থাকার সুযোগ পাবে না। পাহাড়ি এলাকায় সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি পাহাড়ে চাষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাহলে শুধু দেশের চাহিদা নয় বরং বিভিন্ন দেশে ড্রাগন ফল রফতানি করা সম্ভব হবে। অনেক কৃষক ড্রাগন ফলের দিকে ঝুঁকছেন। এটা সম্ভাবনাময়ী একটি ফল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের ১২ শতাংশ ভূমি পাহাড়ি। এর দুই-তৃতীয়াংশ ভূমি চাষযোগ্য। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর বড় একটি অংশ পতিত থেকে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব জমি ড্রাগন চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় চাষীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে তাদের লাভজনক এ ফলটি চাষে সম্পৃক্ত করা সম্ভব।