দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিল ডাকাতিয়া। ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রাম রয়েছে বিলের আশপাশে। বর্ষা মৌসুমে শেষে দেশের খাল-বিলের পানি কমতে শুরু করে। বাংলার ঋতুচক্রে প্রকৃতিতে শীত মৌসুম শুরু হলেও অন্তত ৩০টি গ্রাম এখনো পানিবন্দি। বছরজুড়েই পানিতে নিমজ্জিত থাকছে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, আশ্রয়ণ প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়, ফসলি জমি, মাছের ঘের। আমন মৌসুমে আবাদ হয়নি অনেক এলাকায়। বোরো আবাদও অনিশ্চয়তার মধ্যে। কর্মহীন এমন পরিস্থিতিতে অভাব-অনটন আর রোগ-ব্যধিতে দুর্বিসহ জীবন কাটছে সেখানকার বাসিন্দাদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, জলাবদ্ধতার সমস্যা কয়েক যুগের। নদী-খাল ভরাটের পাশাপাশি দখল, জলকপাট অকেজো, ব্যক্তি পর্যায়ে অপরিকল্পিত ও অবৈধ ব্রিজ-পুল নির্মাণ এবং খালে নেট-পাটা ও বাঁধের কারণে বছরজুড়ে জলাবদ্ধ থাকতে হয় তাদের।

ডুমুরিয়া উপজেলা পানি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক জিএম আমান উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডাকাতিয়াসহ ছোট-বড় ২৭টি বিল, ১৩৬টি খাল ও ১১টি নদ-নদী রয়েছে ডুমুরিয়ায়। এসব বিলের পানি মূলত খাল দিয়ে নদ-নদীতে যায়। তবে খালগুলোর অধিকাংশ দখল ও নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। পলি জমেছে পানি নিষ্কাশনের জলকপাটেও। এতে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানি নিষ্কাশন ঠিকমতো না হওয়ায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে।’

অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক আবদুল কাদের খান বলেন, ‘বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের জলাবদ্ধতা শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও অবহেলার ফলও। এটি এখন রূপ নিয়েছে মানবিক বিপর্যয়ে। বর্ষা মৌসুমে এখানকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। গত দুই-তিন বছর বৃষ্টি কম ছিল। কিন্তু এ বছর টানা বৃষ্টিতে ডুমুরিয়া উপজেলার উত্তরাঞ্চলের অন্তত ২০-২৫টি গ্রাম জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। পার্শ্ববর্তী ফুলতলা উপজেলার চার ইউনিয়নেরও অনেক গ্রাম জলাবদ্ধ রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে বিস্তীর্ণ এ অঞ্চলে মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়েছে।’

এ ব্যাপারে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন বলেন, ‘বিল ডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার পানি শোলমারী ও হামকুড়া নদী দিয়ে নিষ্কাশন হতো। কিন্তু হামকুড়া নদী পুরোপুরি ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ শোলমারী নদী। তবে গত তিন বছর ধরে শোলমারী নদী ও পানি নিষ্কাশনের জলকপাটগুলোর মুখ পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না।’

খুলনা নগরের খানজাহান আলী, আড়ংঘাটা থানা, ডুমুরিয়া, ফুলতলা উপজেলা ও যশোরের কেশবপুর, মনিরামপুর এবং অভয়নগর উপজেলার অংশ বিশেষ নিয়ে বিল ডাকাতিয়ার বিস্তৃতি। প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর আয়তনের বিল ডাকাতিয়ার সঙ্গে রয়েছে বরুণা, মধুগ্রাম, তাওয়ালিয়া, কপালিয়া, দোহাকুলা, খুকশিয়া, শিংগা, মাধবকাটি, খড়িয়া ও মির্জাপুরসহ অসংখ্য বিল।

কৃষি ও মৎস্য সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, একসময় কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের জন্য বিল ডাকাতিয়ার খ্যাতি থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন ও জলাবদ্ধতার কারণে তা কমেছে। বিল ডাকাতিয়ার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা অংশে প্রায় তিন হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমি রয়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন কেন্দ্রীয় পানি কমিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোয় বছরে প্রায় ১০৬ কোটি টন পলি প্রবাহিত হয়। যা এক সময় নদীসংলগ্ন নিচু ভূমি, কৃষিজমি ও বসতভিটায় জমা হতো। কিন্তু বেড়িবাঁধের নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পলি এখন জমা হচ্ছে নদীতে।

নদ-নদীবিষয়ক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) তাদের গবেষণায় বলেছে, দেশে অন্তত ৮১টি নদ-নদী পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে বা চরম সংকটাপন্ন হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। যার মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বাধিক ২৫টি নদ-নদী রয়েছে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের (সিইপিআর) চেয়ারপারসন গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, ‘নদী শাসনের নামে আমরা প্রকৃতপক্ষে পানিপ্রবাহের ক্ষমতা নষ্ট করছি। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও পলির যথাযথ ব্যবস্থাপনা না করায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। নদী ও খালে বাঁধ নির্মাণে উপকূলীয় নদ-নদীর গতিবেগ কমে গেছে, নদীগুলো পলি পরিবাহিত করতে পারছে না, তলদেশ ভরাট হয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় পানির চাপে তলিয়ে যাচ্ছে। আগে জোয়ারে প্লাবন হলেও ভাটায় পানি নেমে যেত, যা এখন নেই। নদীগুলো সচল না হলে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে।’

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার উপসহকারী প্রকৌশলী (পুর) তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৯২-৯৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ইমার্জেন্সি অ্যাকশন প্ল্যানের আলোকে খুলনা-যশোর নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প (কেজেডিআরপি) নামে ২২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়। বিল ডাকাতিয়া এলাকায় এটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রকল্প। ২০১৭ সালে বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলে আবারো জলাবদ্ধতা দেখা দিলে ২০১৮-২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্লু গোল্ড নামে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। শলুয়া জলকপাট থেকে বিল ডাকাতিয়ার মাঝামাঝি পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খালটি খননের পর থেকেই বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাশন শুরু হয়। এরপর বেশ কয়েক বছর মোটামুটি জলাবদ্ধতামুক্ত ছিল বিল। কিন্তু গত কয়েক বছর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় শোলমারী ও ভদ্রা নদী দিয়ে বিলের পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না। কৈয়ার সংযোগ নদীও পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ২০১৯ সালে ভদ্রা-সালতা খনন প্রকল্প নামে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ভদ্রা নদীর ২১ কিলোমিটার ও সালতা নদীর নয় কিলোমিটার খনন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু খননের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই আবার তা পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমাধানে সরকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করেছে। সমন্বিতভাবে কীভাবে সমগ্র এলাকার পানি নিষ্কাশন করা যায়, সে লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন। বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে।’