কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বর্ধিত গৃহকর নিয়ে নগরবাসীর অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। বর্ধিত গৃহকর বাতিলে সর্বস্তরের আন্দোলনও চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল—মনগড়া মূল্যায়নের (ভ্যালুয়েশন) মাধ্যমে স্থাপনার বাড়তি গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, কর্মচারীরা ‘ঘুস বাণিজ্য’ করেছেন। গৃহকর নিয়ে চসিকের এ সংকট জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পুলিশের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের মুখে স্থগিত হয়ে যাওয়া বর্ধিত গৃহকর আদায় কার্যক্রম আবার শুরু হলে নগরবাসীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বর্ধিত গৃহকর আদায় শুরু হলে ভবন মালিকদের পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। খরচের চাপ সামলাতে বাসা ভাড়া বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবেন ভবন মালিকরা। এতে বন্দরনগরীর সব মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।

চসিকের গৃহকর আদায় কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে গোপন প্রতিবেদন সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ছাড়াও স্থানীয় সরকার বিভাগে দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে নতুন পদ্ধতিতে গৃহকর আরোপ না করে আগের পদ্ধতিতেই গৃহকর আদায়সহ পাঁচটি বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। গৃহকর আদায় সম্পর্কিত বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে গত ৩১ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলাম। আর সিটি করপোরেশনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গত ২৮ নভেম্বর চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনের একটি কপি বণিক বার্তার কাছে এসেছে।

প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে সেটি বাস্তবায়নও হয়েছে। যেসব ভবন মালিকের গৃহকর মূল্যায়নের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে আপিল বোর্ডের মাধ্যমে তারা সংকট সমাধান করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার দেয়া প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে চসিকের সপক্ষে যথার্থ জবাব দেয়ার প্রস্তুতি চলছে।’

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করদাতা সুরক্ষা পরিষদের ব্যানারে চট্টগ্রামের ভবন মালিক আন্দোলনকারীরা এতদিন প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগই করে আসছিলেন। এখন সরকারি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনেও চসিকের বর্ধিত গৃহকর আদায় কার্যক্রম নিয়ে এমন সব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বন্ধে সিটি করপোরেশনের এ বর্ধিত গৃহকর আদায় প্রক্রিয়া বন্ধ রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ায় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে।

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সময় ২০১৭ সালে কর পুনর্মূল্যায়নের পর বার্ষিক কর নির্ধারণ করা হয় ৮৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা আগে ছিল ১৩১ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আগে স্থাপনার আয়তনের ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণ করা হলেও আ জ ম নাছির উদ্দীনের সময় বাড়ি ভাড়ার ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণ করা হয়। এতে গৃহকর আগের তুলনায় তিন থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর প্রতিবাদে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের মুখে ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর ওই গৃহকর আদায় কার্যক্রম স্থগিত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

তবে চলতি বছরের শুরুতে বর্তমান মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর অনুরোধে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় মন্ত্রণালয়। তিনি গৃহকর আদায় কার্যক্রম শুরু করলে নগরবাসীর মধ্যে আবার ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

করদাতা সুরক্ষা পরিষদ ফের আন্দোলনে নামে বর্ধিত গৃহকর বাতিলের দাবিতে। সিটি করপোরেশন এতদিন ধরে স্থাপনার বর্গফুটের ভিত্তিতে গৃহকর আদায় করে আসছিল। বিভিন্ন এলাকার জমি ও ভবনের মূল্যকে গুরুত্ব দিয়ে একেক এলাকায় একেক ধরনের গৃহকরের হার নির্ধারিত ছিল। ওই সময় প্রতি বর্গফুট দেড় টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২ টাকা পর্যন্ত গৃহকর আদায় করা হতো। একটি উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকার একটি ছয়তলা ভবনের ১০টি ফ্ল্যাটের জন্য আয়তনের ভিত্তিতে বছরে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা গৃহকর দিতে হতো। কিন্তু নতুন পদ্ধতির কারণে গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। যা আগের চেয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বেশি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়ি ভাড়া জরিপে মনগড়া মূল্যায়ন (ভ্যালুয়েশন), ক্ষেত্রবিশেষে অনৈতিক সুবিধা দেয়া, বেশি বাড়ি ভাড়া প্রদর্শন করেছেন। অবৈধ আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। গৃহকর কমানোর জন্য আপিল করার সময়ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গৃহকরবিরোধী আন্দোলন কার্যক্রমকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের অপচেষ্টা করতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

জানতে চাইলে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষ খুবই অস্বস্তিতে আছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন একতরফাভাবে বর্ধিত গৃহকর আদায়ের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। করদাতা সুরক্ষা পরিষদ আন্দোলন করলেও তাদের কথা আমলে নেয়া হচ্ছে না। খোদ সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বর্ধিত গৃহকর নিয়ে মানুষের অসন্তোষের কথা বলা হয়েছে।’