চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্ববাজার থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। এর মধ্যে চীন থেকে এসেছে ১১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বিপরীতে একই সময়ে চীন সারা বিশ্ব থেকে ২ হাজার ৪০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। যেখানে বাংলাদেশ পাঠাতে পেরেছে মাত্র ৬০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ পণ্য চীন থেকে আমদানি করলেও দেশটিতে রফতানি করে ১ শতাংশেরও কম। দুই দেশের মধ্যে এমন বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে চীন ২০২০ সালের জুলাই থেকে ট্যারিফ লাইনের আওতায় ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশী পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চালু করে। সম্প্রতি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে সেটি বাড়িয়ে ৯৮ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির সরকার। এ সুবিধা পাওয়ার পরও প্রচলিত পণ্য দিয়ে চীনের বাজার দখল নেয়া খুব কঠিন হবে বলে মনে করছে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল উইং। এ বিষয়ে সম্প্রতি উইংয়ের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন থেকেই প্রশ্ন উঠছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে এত রফতানি করে কারা। চীনের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরির সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। দেশটিতে রফতানি বাড়াতে কয়েক বছর থেকে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনা চলছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, রফতানিকারক ও অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টদের মাঝে এ নিয়ে আলোচনা হয়।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল উইংয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চীনের বাজার বিশাল হলেও প্রতিযোগিতামূলক। স্থানীয় উৎপাদন-সরবরাহকারীদের সঙ্গে ভালো মানের বিদেশী কোম্পানিই এখানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। তবে কনজিউমার বিহেভিয়ার বা ভোক্তাদের আচরণগত ধরন অনুসারে বলা যায়, উচ্চহারে মূল্য সংযোজিত পণ্যের চাহিদা দেশটিতে ক্রমেই বাড়তে থাকবে। বর্তমানে চীনের বাজারে রফতানি বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত পণ্য ও অনলাইনে এসব পণ্যের ব্যাপক হারে প্রচারণা থাকতে হবে। দেশটির প্রধান ২০ আমদানি পণ্যের একটিও রফতানি করে না বাংলাদেশ। তাই প্রচলিত পণ্য দিয়ে চীনের বাজার কোনোভাবেই দখল করা সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বণিক বার্তাকে বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চীনসহ অন্যান্য দেশে রফতানি বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার। চীনে রফতানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা উঠে আসছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে কাজ করা হচ্ছে। এতে চীন বাংলাদেশকে যে সুবিধা দিচ্ছে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সহজ হবে।
গত কয়েক বছর বাংলাদেশ থেকে চীনের বাজারে রফতানীকৃত প্রধান ১০টি পণ্যের পর্যালোচনামূলক তথ্য তুলে ধরেছে কমার্শিয়াল উইং। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পাঁচটি প্রচলিত পণ্যের তিনটিরই রফতানি কমেছে। অন্যদিকে পাঁচটি অপ্রচলিত পণ্যের সবগুলোরই রফতানি বেড়েছে। প্রচলিত ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, মত্স্য এবং ত্রাস্টেসিয়ান ও মোলাস জাতীয় পণ্য ক্রমন্বয়ে কমছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীনে ওভেন পোশাক রফতানি হয় ২৮ কোটি ২৫ লাখ ডলারের, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলারে। আর চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ৬ কোটি ৫২ লাখ ডলারের। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিটওয়্যার রফতানি হয় ২২ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরে রফতানি কমে দাঁড়ায় ১২ কোটি ৫৭ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ৪ কোটি ৫১ লাখ ডলারের। মত্স্য, ত্রাস্টেসিয়ান ও মোলাস জাতীয় পণ্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীনে রফতানি হয় ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের। ২০২০-২১ অর্থবছরে রফতানি কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪২ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ ডলারের।
তবে প্রচলিত হলেও জুট ফ্যাব্রিকস ও কাঁচা চামড়া রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীনে ১০ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের জুট ফ্যাব্রিকস রফতানি করে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৪৮ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কাঁচা চামড়া রফতানি হয় ৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের।
এদিকে পাঁচটি অপ্রচলিত পণ্যেরই রফতানি প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো বলে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয়রন-স্টিল পণ্যের রফতানি ছিল ১৪ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ পণ্য রফতানি হয়েছে ২ কোটি ৬ লাখ ডলারের। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পরচুলা ও মানুষের মাথার চুল রফতানি হয় ৯ লাখ ডলারের। সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ১৩ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ পণ্য রফতানি হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের।
এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পণ্যটির রফতানি দাঁড়িয়েছে ৮৫ লাখ ১০ হাজার ডলারে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কপার অ্যান্ড আর্টিকেলস রফতানি হয় ৭ লাখ ৮০ হাজার ডলারের। সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪২ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পণ্যটির রফতানি দাঁড়িয়েছে ৬৯ লাখ ডলারের। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অ্যালুমিনিয়াম অ্যান্ড আর্টিকেলস রফতানি হয় ৩ লাখ ১০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪২ লাখ ডলারে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ৬২ লাখ ডলারের পণ্য।
কমার্শিয়াল উইং বলছে, ২০২১ সালে চীনের মোট আমদানির ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশই এসেছে চীন নিয়ন্ত্রিত তাইওয়ান থেকে। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চিলি, ইতালি, কানাডা, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পণ্য আমদানি করে চীন। তবে বর্তমানে চীনের প্রধান ২০ আমদানি পণ্যের একটিও বাংলাদেশ রফতানি করে না। তাই চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা খুব বেশি নয়। তবে চীন একটি বড় বাজার হওয়ায় বাংলাদেশের রফতানীকৃত পণ্যের চাহিদা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র আল মামুন মৃধা বণিক বার্তাকে বলেন, সবকিছু মেনে চীনের বাজার দখল করা কঠিন। তবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে রফতানি বাড়াতে কাজ করছে। আশা করছি, আমরা চীনের দেয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে পারব।










