দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চোরাচালানের জন্য সংগ্রহ করা পণ্য সেখানে এনে সংরক্ষণ করা হয় গোপনে। পরে সুবিধাজনক সময় ও পরিস্থিতি বুঝে সেগুলো সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দেয়া হয় প্রতিবেশী দেশে।

সাম্প্রতিক সময়ে এ চক্রের তৎপরতা যেন আরো বেড়েছে। গত দুই মাসে ফরক্কাবাদ সীমান্ত থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জব্দ করেছে কষ্টিপাথরের অন্তত পাঁচটি বিষ্ণুমূর্তি। পাচারের উদ্দেশ্যে বিরল এ মূর্তিগুলো মজুদ রাখা হয়েছিল ওই এলাকায়। কেবল ফরক্কাবাদই নয়, সারা দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে গত চার মাসে পাচারের সময় জব্দ করা হয়েছে কষ্টিপাথরের অন্তত ১৮টি ও বেলেপাথরের একটি বিরল মূর্তি।

বিজিবি সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চারের সময় সীমান্ত এলাকা থেকে গত জানুয়ারিতে একটি কষ্টিপাথরের মূর্তি জব্দ করা হয়। পরের মাসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিনটিতে। তার পরের মাস অর্থাৎ মার্চে জব্দ করা হয় ১২টি বিষ্ণুমূর্তি। এর মধ্যে ১১টি কষ্টিপাথরের মূর্তি আর একটি বেলেপাথরের। এছাড়া চলতি মাসে এখন পর্যন্ত তিনটি কষ্টিপাথরের মূর্তি জব্দ করা হয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, পাচারের আগে সীমান্ত থেকে জব্দ মূর্তিগুলোর পাঁচটিই পাওয়া গেছে ফরক্কাবাদ ইউনিয়নে। মূলত এ ইউনিয়নটিকে পাচারকারীরা ট্রানজিট বা অপেক্ষার স্থান হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এজন্য সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েকটি শক্তিশালী চক্র। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি চোরাচালানের ঘটনার পর ফরক্কাবাদ ইউনিয়নে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি।

এ বিষয়ে বিজিবির দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের (৪২ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, ‘দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি মাদক, মানব পাচার, অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আমরা সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, কষ্টিপাথরের মূর্তিগুলো সাধারণত প্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এসব নিদর্শনের বয়স কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তাই এগুলোর ব্যাপক চাহিদা। এ চাহিদাকেই পুঁজি করে পাচার চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এ পাচার কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, যারা ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে। প্রথমে দেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থল বা মন্দির থেকে মূর্তি চুরি করা হয়। এরপর তা নিরাপদ স্থান, যেমন ফরক্কাবাদ ইউনিয়নের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। সবশেষে সুবিধাজনক সময়ে পাচার করে দেয়া হয় সীমান্তের ওপারে। প্রতিটি ধাপে আলাদা ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকায় পুরো চক্রটিকে শনাক্ত ও ভেঙে দেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, প্রত্ননিদর্শন পাচার বন্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত দিয়ে প্রত্ননিদর্শন পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পাচারের সময় অনেক ক্ষেত্রে এসব নিদর্শন ধরা পড়লেও পুরো চক্রটি ধরার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়িত কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।’

inside

ড. তৌহিদুল হক আরো বলেন, ‘প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষিত স্থানগুলোয়ও নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এসব নিদর্শন দেশের মধ্যেই সংরক্ষণ করা উচিত। যারা পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এ অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নওগাঁ ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় প্রাচীন বহু নিদর্শন রয়েছে। সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট এলাকাও প্রাচীন নিদর্শনের জন্য বিখ্যাত। সেখানে বেশকিছু বিহার রয়েছে। ওইসব বিহার খনন করে যেসব প্রত্নসম্পদ পাওয়া গেছে, সেগুলো বালুরঘাটের একটি প্রত্ন জাদুঘরে সংরক্ষণ করা রয়েছে। তবে এদেশের প্রত্নবস্তু ঘিরে গড়ে উঠেছে পাচারকারী চক্র।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের জয়পুরহাট ব্যাটালিয়নের (২০ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ লতিফুল বারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষা এবং সীমান্ত দিয়ে যেকোনো ধরনের পাচার ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। এছাড়া ফরক্কাবাদ থেকে পাচারের সময় আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কষ্টিপাথরের মূর্তিগুলো কেবল ধর্মীয় উপাসনার উপকরণ নয়, বরং এগুলো দেশের ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব নিদর্শন বিদেশের জাদুঘর বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যায়, যা পরে উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এ ধরনের অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া জরুরি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন পাচারকারীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, এ চক্রের সঙ্গে দেশের বাইরে থাকা কিছু ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক পাচার সিন্ডিকেট জড়িত। মূলত বিদেশী সংগ্রাহক, ব্যক্তিগত জাদুঘর এবং অবৈধ প্রাচীন সামগ্রীর বাজারে এসব মূর্তির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে বিপুল লাভের আশায় পাচারকারীরা ঝুঁকি নিয়েও এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

দেশের সীমান্ত দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাচার রোধ এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়েছেন বিজিবির উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক প্রত্নসম্পদ সুরক্ষায় বিজিবি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। সেই সঙ্গে আধুনিক স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় সিসিটিভি, থার্মাল ইমেজিং এবং দুর্গম সীমান্ত এলাকায় ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা হয়েছে, যা সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।’