শীতের শুরুতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেখা দিয়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। গত এক সপ্তাহে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৭১ জন। এখনো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ১০৩ জন। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু। তবে জেলা শহরের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির ডায়রিয়া ও শিশু বিভাগ মিলিয়ে শয্যা রয়েছে ৪৫টি। শয্যার তুলনায় রোগী বেশি হওয়ায় অনেকে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকটে অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা।

হাসপাতালের তথ্য বলছে, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ২০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি আছে ৮৮টি রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে আরো ২৫ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৩৫ জন। শিশু ওয়ার্ডে ২৫টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ৩৯টি শিশু। নতুন করে ভর্তি হয়েছে আরো ১২টি শিশু। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৩১টি শিশু। এছাড়া নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে ভর্তি রয়েছে আরো পাঁচ শিশু।

হঠাৎ ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালের দুই বিভাগেই প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ডায়রিয়া বিভাগে সিপ্রো, মেট্রো, মেরোপেন, ফ্লুক্লক্স, কাসিন, ক্যানোলা, স্যালাইন সেট, উইন্ডেল প্লাস, বুডিকর্ট এবং শিশুদের জন্য জরুরি জিংক সিরাপ—এসব একেবারেই নেই। তবে সীমিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে কলেরা স্যালাইন, সেফট্রিয়াক্সোন, ওমিপ্রাজল, ইমিস্টেট, কটসন, নাপা, ফেক্সো, টোফেন ও ওআরএস। এছাড়া শিশু ওয়ার্ডে মেরোপেন, ফ্লুক্লক্স, কাসিন, কটসন, বেবি স্যালাইন, ইলেকট্রোডক্স, ক্যানোলা, উইন্ডেল প্লাস ও বুডিকর্ট সংকট রয়েছে। তবে সীমিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে কেবল সেফট্রিয়াক্সোন, ওমিপ্রাজল, ইমিস্টেট, টাজিড, নাপা ও ফেক্সো সিরাপ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, শীতের সময় শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক ও জিংক সিরাপের অভাব দেখা দিয়েছে।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ রয়েছে। তবে কিছু সরঞ্জাম বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে যা আমাদের এখানে নেই। শীতের কারণে রোগী বেড়েছে। চিকিৎসকরা প্রতিদিনই রাউন্ড দেন। শুক্রবার অন্য চিকিৎসকরা রাউন্ড দেন। এখন থেকে চিকিৎসকরা ইনডোরেও রাউন্ডে দেবেন।’

রোগীর স্বজনরা জানান, দুই বিভাগে মেডিসিন ও শিশু কনসালট্যান্টসহ ১০ জন চিকিৎসক প্রতিদিন সকালে রাউন্ডে আসেন। তবে বিকাল বা রাতে আর কেউ রাউন্ডে আসেন না। ফলে ওষুধের ডোজ অ্যাডজাস্টমেন্ট, সাপোর্টিভ কেয়ার ও জরুরি ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। বিশেষ করে শুক্রবার কোনো কনসালট্যান্ট বা মেডিকেল অফিসারের রাউন্ড না থাকায় চিকিৎসায় ঝুঁকি বাড়ছে।

সদর উপজেলার ভোলাচং গ্রামের মোসা. শিল্পী বেগমের নাতনি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকরা সব সময় রাউন্ডে আসেন না। প্রয়োজনে নার্সদের ডেকেও পাওয়া যায় না।’

বুধল গ্রামের ঝর্ণা বেগম ছেলেকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। হাসপাতালে আসার পর সরকারিভাবে একটি বা দুটি ওষুধ পেয়েছেন। ডাক্তারের লেখা বাকি সব ওষুধ দোকান থেকে কিনে আনতে হয়েছে। ঝর্ণা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। এত দামি ওষুধ কিনতে ঋণ করতে হচ্ছে।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুই বিভাগের ইনচার্জসহ ২২ জন নার্স সেবা দিচ্ছেন। রোগীর তিন বেলা ইনজেকশন পুশ, ওষুধ সেবন, স্যালাইন ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

নার্স ইনচার্জ জুলেখা বলেন, ‘তিন বেলা ইনজেকশন পুশ, ওষুধ সেবন, স্যালাইন ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিক সেবা নিশ্চিত করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

হাসপাতালে ওষুধের ঘাটতি থাকায় নিম্ন আয়ের রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরো দুঃসহ হয়ে উঠেছে। সকালে সামান্য পরিমাণে ওষুধ মিললেও বিকাল ও রাত থেকে প্রায় সব ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে তাদের। জেলার জনসংখ্যা ৩৫ লাখ ছাড়ালেও একমাত্র সরকারি হাসপাতালটি এখনো ২৫০ শয্যা রয়ে গেছে। রোগীর চাপ অনুযায়ী হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা প্রয়োজন।

তাদের অভিযোগ, ওষুধ ঘাটতি, সীমিত বেড, পর্যাপ্ত জনবল না থাকা, চিকিৎসকদের অনিয়মিত রাউন্ড এবং মনিটরিংয়ের অভাবে রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছে। ডায়রিয়া ও শিশু বিভাগের জন্য জরুরি অ্যান্টিবায়োটিক, স্যালাইন, শিশুদের ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের বরাদ্দ দ্রুত নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ব্যাপারে শিশু কনসালট্যান্ট ডা. আখতার হোসাইন বলেন, ‘আমরা প্রতিনিধি সকাল, বিকাল ও রাতে রাউন্ডে এসে রোগীদের ওষুধের ডোজ অ্যাডজাস্টমেন্ট, সাপোর্টিভ কেয়ার ও জরুরি ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছি।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শীতের এ সময়টায় ঠাণ্ডাজনিত সমস্যাগুলোই বেশি দেখা যায়। যেমন কাশি, অ্যাজমার প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, সাময়িক জ্বর, কোল্ড অ্যালার্জি হয়ে থাকে। এ সময় বাতাসে ধুলাবালি বেশি থাকায় অনেকে অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষদের কাশি, কোল্ড অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঠিক সময়ে শনাক্ত করা না গেলে সেটা অনেক সময় নিউমোনিয়াতেও রূপ নিতে পারে। হঠাৎ করে ঠাণ্ডার কারণে শিশুদের, অনেক সময় বড়দেরও ডায়রিয়া হতে দেখা যায়। বিশেষ করে যখন বেশি ঠাণ্ডা পড়ে, তখন বয়স্কদেরও পাতলা পায়খানা হতে পারে।