কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন হ্রাস, অন্যান্য মাছ উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা এবং নাব্য সংকটসহ নানা কারণে মৎস্য উৎপাদনে জৌলুশ হারিয়েছে কাপ্তাই হ্রদ। দুই বছর ধরে কাপ্তাই হ্রদের মাছ উৎপাদন রেকর্ড পতন হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে গত পাঁচ মৌসুমের মাছ অবতরণের বার্ষিক হিসাবে তিন মৌসুম ধরে ক্রমান্বয়ে অবতরণ রেকর্ড হলেও দুই মৌসুম ধরে পতন ঘটেছে। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমেছে। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, কাপ্তাই হ্রদে পানিস্বল্পতার কারণে গত দুই মৌসুমে নির্ধারিত সময়ের পর মাছ ধরা শুরু হওয়ায় বার্ষিক হিসাবে মাছ অবতরণ কমেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ। রাঙ্গামাটির আট উপজেলা ও খাগড়াছড়ি জেলার দুই উপজেলায় বিস্তৃত কাপ্তাই হ্রদ। কাপ্তাই হ্রদ দেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধজলাশয়গুলোর মধ্যে বৃহৎ। প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর আয়তনের এ হ্রদটি দেশের পুকুরগুলোর মোট জলাশয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ মোট জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। ১৯৬১ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এ হ্রদের সৃষ্টি হলেও এটি মৎস্য উৎপাদন ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। হ্রদের ওপর নির্ভরশীল রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ির প্রায় ২৫ হাজার জেলে পরিবার।

বিএফডিসি সূত্র জানায়, কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের বংশবৃদ্ধি, হ্রদে অবমুক্ত করা পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধি, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিতকরাসহ হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতি বছরের ১ মে-৩১ জুলাই পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে তিন মাস মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয় নতুন মৌসুম। আগস্ট থেকে পরবর্তী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ নয় মাসকে মৌসুম ধরা হয়। পানিস্বল্পতার কারণে ২০২১-২২ মৌসুমে এক মাস দেরিতে মাছ আহরণ শুরু হয়। সেক্ষেত্রে এ মৌসুমে হ্রদ থেকে মাছ আহরণ করা হয়েছে মূলত আট মাস। এর আগে ২০২০-২১ মৌসুমেও একই কারণে ১০ দিন দেরিতে মাছ আহরণ শুরু হয়; এ মৌসুমেও উল্লেখজনকভাবে মাছ অবতরণ হ্রাস হয়েছে।

বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণন কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি ২০২১-২২ মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদ থেকে ৬ হাজার ৫০৩ টনের অধিক মাছ অবতরণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে বিএফডিসির রাজস্ব আদায় হয়েছে ১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২০-২১ মৌসুমে ৬ হাজার ৭৯৪ টন মাছ অবতরণের বিপরীতে ১২ কোটি ১৩ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর আগের ২০১৯-২০ মৌসুমে ৮ হাজার ৫৬২ টন মাছ অবতরণের বিপরীতে ১৫ কোটি ৩৬ লাখ; ২০১৮-১৯ মৌসুমে ৮ হাজার ৪৫৭ টন মাছ অবতরণের বিপরীতে ১২ কোটি ৭৮ লাখ; ২০১৭-১৮ মৌসুমে ৮ হাজার ১১৪ টন মাছ অবতরণের বিপরীতে ১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মৎস্য অবতরণের বার্ষিক হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ মৌসুম থেকে ২০১৯-২০ মৌসুম পর্যন্ত এ তিন মৌসুমে অবতরণ ও রাজস্ব আদায় দুটিই বেড়েছে। ২০২০-২১ মৌসুমে অবতরণ ও রাজস্ব আদায়ে ধাক্কা লেগেছে। এক মৌসুমের ব্যবধানে অবতরণ কমেছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টন। অন্যদিকে ২০২১-২২ মৌসুমে অবতরণ কমেছে ২ হাজার টনের অধিক। অবতরণকৃত বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে কেঁচকি, চাপিলা ও মলাসহ দেশীয় প্রজাতির মাছের আধিক্য থাকলেও কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন উল্লেখজনক বাড়েনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণন কেন্দ্রের সহকারী বাজারজাতকরণ কর্মকর্তা শোয়েব সালেহীন বণিক বার্তাকে জানান, ২০২১-২১ অর্থবছরে ৬ হাজার ৫০৩ টনের অধিক মাছ অবতরণের বিপরীতে ১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। আগস্টজুড়ে মাছ আহরণ বন্ধ থাকার কারণে চলতি  মৌসুমে জেলেরা মাছ আহরণ করেছেন আট মাস। যে কারণে মাছ অবতরণ ও রাজস্ব আদায় দুটিই কমেছে। এর আগের বছরেও প্রথম ১০ দিন আহরণ বন্ধ থাকায় একই সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা আশাবাদী আগামী মৌসুমগুলো এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।

এদিকে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের একাধিক মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো যাবে না। আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত কারণে গত দুই আহরণ মৌসুমে দেরিতে মাছ ধরা শুরু হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে বিএফডিসির ধারাবাহিক মৎস্য উৎপাদনের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।