দেশে চিংড়ি উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে বাগেরহাট। তবে মৌসুমের শুরুতে মানসম্মত পোনার সংকট ও টানা বৃষ্টিতে রোগ ছড়িয়ে পড়ায় মারা যাচ্ছে বাগদা চিংড়ি। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষীরা। তারা বলছেন, ভাইরাস, পানিস্বল্পতা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও লাগাতার বৃষ্টির কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

চাষীদের অভিযোগ, ভাইরাসের পাশাপাশি অনুকূল পরিবেশ না থাকায় ঘেরে চিংড়ি মারা যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। গত বছরের মতো এবারও শুরুতে মানসম্মত পোনা সংকটে পড়েছিলেন চাষীরা। এরপর একের পর এক বৃষ্টি আর তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তনে মারা যাচ্ছে সাদা সোনাখ্যাত চিংড়ি।

চাকশ্রী বাজারের চিংড়ি চাষী মো. শাহজাহান বলেন, ‘গত বছর এ সময় ৪০-৫০ কেজি চিংড়ি ধরতাম। এখন জাল ফেললেও চিংড়ি মিলছে না। লাখ টাকার পোনা দিয়েছি, ঘের এখন শূন্য অবস্থায় রয়েছে।’

রামপাল উপজেলার সেলিম হোসেন বলেন, ‘আমাদের ঘেরে এখন যা অবস্থা, তাতে ঋণ শোধ করাই মুশকিল হবে। এ অবস্থা চললে আগামী মৌসুমে চাষ করা কঠিন হয়ে যাবে।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চিংড়ি চাষ করছেন। দিন যতই যাচ্ছে, উৎপাদন ততই কমছে। ২০০৫ সালের পর থেকে বিভিন্ন রোগে চিংড়ি আক্রান্ত হচ্ছে। তিন-চার বছর ধরে নতুন আরো একটি রোগ দেখা দিয়েছে। তবে এটি কী ধরনের রোগ তা শনাক্ত করা যায়নি।

জেলা চিংড়ি চাষী সমিতির সভাপতি ফকির তৌহিদুর রহমান সুমন বলেন, ‘বাগদা চিংড়ি মারা যাওয়ার সঠিক কারণ উদঘাটনে আমরা চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের সহযোগিতা চেয়েছি। বিজ্ঞানভিত্তিক রোগ নির্ণয় ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব আছে কিনা, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।’

কচুয়া উপজেলার কলমিবুনিয়া গ্রামের রসুল শেখ বলেন, ‘আগে একেকবারে ১০-১২ কেজি বা ২০ কেজি পর্যন্ত চিংড়ি উঠলেও এখন সর্বোচ্চ এক কেজির মতো চিংড়ি মিলছে। প্রথম দফায় সব চিংড়ি মরে গেছে, দ্বিতীয় দফায় যে পোনা ছেড়েছি তা বড়ই হচ্ছে না।’

সাংদিয়া গ্রামের জাফর শেখ ও গোপাল দাস জানান, এ বছর চিংড়ির পোনা ঘেরে ছাড়ার পর পরই মারা যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, ‘আমরা পুরো বিনিয়োগ হারিয়েছি, এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পানি স্বল্পতা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং টানা বৃষ্টিপাতে লবণ পানির চিংড়ি মারা যাচ্ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পানির লবণাক্ততা কমে গেছে, যা বাগদা চাষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চাষীদের পরিকল্পিতভাবে পোনা নির্বাচন, ঘের প্রস্তুতি এবং পানি ব্যবস্থাপনা করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’

সরকারি হিসাব বলছে, বাগেরহাটে ৫১ হাজার ১৫৯ হেক্টর জমিতে ৪৬ হাজার ৩১৩টি বাগদা চিংড়ি ঘের রয়েছে। গত অর্থবছরে জেলায় ২০ হাজার ৯৪০ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। তবে এবার উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অনেক কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষীরা।

চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রোগ শনাক্ত করতে আক্রান্ত ঘের থেকে পানি ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলাফল দ্রুত জানানো হবে, যাতে চাষীরা সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে পোনার মান খারাপ হলে যতই ব্যবস্থা নেয়া হোক, ভালো ফল পাওয়া সম্ভব নয়।’