গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারক মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, গুমের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কালিমা মোচন হবে। বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আর গুমে জড়িতদের ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় পুরো বাহিনীর ওপর বর্তায় না।

আজ মঙ্গলবার (৪ মার্চ) দুপুরে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মইনুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নাগরিকদের গুম করার অভিযোগ আছে, তাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনুসন্ধান করছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, গুমের সঙ্গে জড়িত কতিপয় ব্যক্তির জন্য পুরো বাহিনী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার যেসব সদস্যরা গুমে জড়িত তা তাদের ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়। কারণ, অপরাধীরা অনেক সময় আইনের হাত থেকে বাঁচতে তার ধর্ম, কমিউনিটি, সামাজিক গ্রুপ, ইত্যাদির আড়ালে লুকাতে চেষ্টা করে। এই প্রবণতাকে বলা হয় আইডেন্টিটি বেজড ডিফেন্স। কিন্তু বিচার কখনো ব্যক্তির পরিচয় দিয়ে হয় না, তা হয় সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। কারণ ফৌজদারি অপরাধ একটি ব্যক্তিগত দায়, এতে কমিউনিটিকে দোষারোপ করার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, কমিশনে দাখিল করা গুম সংক্রান্ত অভিযোগসমূহের মধ্য হতে ৭৪টি অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে।

গুমের শিকার হয়ে ফিরে না আসা ৩৩০ জন ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা বা ভাগ্য সম্পর্কে অনুসন্ধান চলছে উল্লেখ করে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সভাপতি বলেন, গুম কমিশন অব ইনকোয়ারিতে আজ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৫২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। যার মধ্য থেকে প্রায় ১ হাজারটি অভিযোগ ও তার সঙ্গে সংযুক্ত কাগজপত্রের যাচাই-বাছাই প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কমিশনে আগত ২৮০ জন অভিযোগকারীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। প্রায় ৪৫ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে।

কমিশনের সভাপতি বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বিজিবির সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে গত ৫ আগস্ট-এর পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের তথ্য চাওয়া হলে বাংলাদেশ পুলিশ ১৪০ জনের তথ্য দিয়েছে। এই তথ্যের প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে কোন গুমের শিকার ব্যক্তির নাম এখনও পাওয়া যায়নি। পুলিশ এবং বিজিবির পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রাপ্তি সাপেক্ষে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তবে গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ্ নামক গুমের শিকার ব্যক্তিকে চাপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর বর্ডার দিয়ে পুশইন করা হয়েছে বলে আমরা অবগত হয়েছি এবং এ বিষয়ে কমিশনের অনুসন্ধান চলছে।

তিনি বলেন, এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে গত দুই-আড়াই বছরে আটক এক হাজার ৬৭ জন বাংলাদেশীর নাম ঠিকানাসহ একটি তালিকা পাওয়া গেছে। আরো তথ্য পাওয়া গেলে কমিশনে প্রেরণ করা হবে বলে লিখিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তালিকায় গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম আছে কি না তার অনুসন্ধান চলছে ।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা ১০ এ(১) ও (২) অনুযায়ী কমিশনে দাখিলকৃত গুম সংক্রান্ত অভিযোগসমূহের মধ্য থেকে ৭৪টি অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিজিএফআইর মহাপরিচালক ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহের গুরুত্বপূর্ণ বাক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এছাড়াও কমিশনের সদস্যরা বিভিন্ন গণসচেতনতা মূলক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভিকটিম পরিবারসহ অংশীজনদের গুম সংক্রান্ত অপরাধ ও এর দায় সংক্রান্ত বিষয়ে অবহিত করেছেন।