চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ৮ মাস ধরে বন্ধ হয়ে আছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় মা ফাতেমা (রাঃ) নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হাতের কাজ করে জীবন ধারণ করতো অঞ্চলটির অবহেলিত নারীরা। নারী উন্নয়নেপ্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রেখে গেলেও এখন বন্ধ থাকায় নতুন করে প্রশিক্ষিত হতে পারছেন না নারীরা। তাই প্রতিষ্ঠানটি চালু করার দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসি ।

জানা গেছে, বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলা দুটি নদী ভাঙ্গন এলাকা। যমুনা নদীর গ্রাসে সহস্র মানুষ তাদের ভিটে-মাটি হারা হয়েছে। অনেকেই সব হারিয়ে ভাসমান জীবন যাপন করছেন। কেউ বা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে নদীপারে বসত গড়েছে। কেউ কেউ নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে অন্যত্র চলে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এসব কারণে প্রতি বছর এলাকায় কর্মহীন লোকের সংখ্যা বাড়ছে।

কর্মহীন লোকের সংখ্যা কমাতে সরকারিভাবে সারিয়াকান্দি উপজেলায় মা ফাতেমা (রাঃ) নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০০৬ সালে কেন্দ্রটি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৪ সালে গ্রামীণ অবহেলিত নারীদের জন্য শুরু হয় সিএনজি চালিত থ্রি হুইলার ড্রাইভিং এবং মোটরসাইকেল মেকানিক্স প্রশিক্ষণ কোর্স। তখন থেকেই কেন্দ্রটিতে গ্রামীণ দরিদ্র, স্বামী পরিত্যাক্তা এবং বাল্যবিয়ের শিকার নারীদের বিভিন্ন দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা ইউনিসেফের সহায়তায় ডাচ বাংলা ব্যাংকসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন।

৩ মাসের কোর্সে মোটরসাইকেল মেকানিক, কনজিউমার ইলেক্ট্রনিক্স এবং ইলেক্ট্রিশিয়ান ৩ টি ট্রেডে এখানে ৫০ জন করে গ্রামীণ অবহেলিত নারী প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। এদের মধ্যে মোটরসাইকেল মেকানিক্সে ১০ জন, কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সে ২০ জন এবং ইলেক্ট্রিশিয়ান এ ২০ জন। প্রশিক্ষণার্থীরা এখানে ফ্রিতে থাকা খাওয়ার সুবিধাও পান। এছাড়া আবাসিক ভবনে নারীরা অবসর সময়ে বিনোদন এবং বিশালাকার মাঠে খেলাধুলা করতে পারেন।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাধারণত আদিবাসী নারীরাই বেশি ট্রেনিং নিয়েছেন এবং চাকরি পেয়েছেন। তারা রাজশাহী, নওগাঁ এবং দিনাজপুর জেলা থেকে আসেন। পাশাপাশি স্বামী পরিত্যাক্তা এবং বিধবা গ্রামীণ অবহেলিত নারীরা এখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ৩ মাসের প্রশিক্ষণকালীন সময়ে বিনামূল্যে থাকা খাওয়ার সুবিধাসহ তারা ৯০০ টাকা প্রশিক্ষণকালীন ভাতা পান। কেন্দ্রটিতে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ জনবল কাঠামো রয়েছে ১৩ জন। ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এখানে ১ হাজার ২১২ জন নারী সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার নারী দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরিও পেয়েছেন।

বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে স্বামী পরিত্যাক্তা ও প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করা সারিয়াকান্দি পৌর এলাকার মোছা. শিলা বেগম জানান, ২০১২ সালে তিনি বাল্যবিবাহের শিকার হন।বিয়ের ৭ বছর পর তার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। তার একটি মেয়ে আছে। কয়েক বছর মা বাবার সংসারে থাকার পর নিজেকে বোঝা মনে হয়। তাই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য মা ফাতেমা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরির সুযোগ পান। কিন্তু এখন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় তার মতো অসহায় নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়ানো থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানান, এখানে বিভিন্ন এলাকার অবহেলিত নারীরা প্রশিক্ষণ করে কাজ খুঁজে নিয়ে জীবনধারণ করতো। কিন্তু এখন প্রশিক্ষণ না থাকলে নারীরা শিখতে পারবে না। সেক্ষেত্রে অবহেলিত নারীরা আরো দুর্ভোগে পড়বে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।  

সারিয়াকান্দি উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা লায়লা পারভিন নাহার জানান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত ডি. ডব্লিউ এ-ইউসেপ পার্টনারশিপ প্রজেক্ট। তাদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ শেষে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষনার্থীদের চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। চুক্তিভিত্তিক প্রজেক্টটির মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। গত বছর জুন মাসেই এ বিষয়ে প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনো আদেশ পাওয়া যায়নি। আশা করি খুব শিগগিরই আবার চুক্তিবদ্ধ হতে পারবো।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. তৌহিদুর রহমান জানান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি দ্রুত চালু করতে উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে কেন্দ্রটি আবারো চালু হয়ে যাবে।