গতকাল সকাল পৌনে ৯টা থেকে বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় কয়েকটি অস্ত্রোপচারে সময়ক্ষেপণ হয়। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় জরুরি অস্ত্রোপচার চালু রাখা হয়। একই সময়ে হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের ছয়টি এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাফিসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন সেবা বন্ধ ছিল। এতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা দুর্ভোগে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তীব্র গরম ও অন্ধকারে দুর্ভোগে পড়ে ভর্তি রোগী এবং তাদের স্বজনরা। পাশাপাশি দূর দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভিন্ন সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকায় ছোট-বড় বিভিন্ন অস্ত্রোপচার নির্ধারিত সময়ে শুরু করা যায়নি। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় জরুরি অস্ত্রোপচার চালু রাখা হয়। একই সময়ে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের ছয়টি এক্স-রে মেশিন ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন বন্ধ থাকায় রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। টিকিট কাউন্টারসহ বিদ্যুৎনির্ভর অন্যান্য কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু হলে পর্যায়ক্রমে সেবাগুলো স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এ প্রসঙ্গে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের প্রধান কাজী মো. আলম জানান, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় সকালে রোগীদের এক্স-রে করা সম্ভব হয়নি। আলট্রাসনোগ্রাফির মেশিন চালাতেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় সেটিও চালু রাখা সম্ভব হয়নি। এতে রোগীদের চাপ বেড়ে পরীক্ষার জন্য লম্বা লাইন পড়ে যায়। পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরীক্ষা করা হয়।’
চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুর অভিভাবক মো. সোলাইমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ওয়ার্ডে ভর্তি ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা তীব্র গরমে দুর্ভোগে পড়েন। ওয়ার্ড অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। স্বজনদের চার্জার ফ্যান ও হাতপাখা দিয়ে রোগীদের বাতাস করতে হয়েছে। গরমে অনেক রোগী আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। এত বড় একটি হাসপাতালে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
পরীক্ষা করাতে আসা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সকালে বিদ্যুৎ না থাকায় এক্স-রে করাতে পারিনি। আমার সঙ্গে আসা আরেকজনের আলট্রাসনোগ্রাফি করার কথা থাকলেও সেটিও হয়নি। জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এখন পরীক্ষার জন্য আবার আসতে হবে।’
নাসিরাবাদ থেকে আসা মো. শরীফ সকাল সাড়ে ৯টায় চক্ষু বিভাগের বহির্বিভাগে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় টিকিট পাইনি। বেলা সাড়ে ১১টার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে টিকিট দেয়া হয়। চিকিৎসক দেখাতে বেলা ২টা বেজে যায়। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে নারী, পুরুষ ও শিশুর দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে আসা অনেক রোগীই সেদিন তা করাতে পারেননি।’
রোগী ও তাদের স্বজনেরা জানান, সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রগুলো জেনারেটরের মাধ্যমে চালানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে অনেক রোগী পরীক্ষা করাতে পারেননি। বিদ্যুৎ আসার পরে কয়েকজন পরীক্ষা করাতে পারলেও বেশির ভাগ রোগীকে আজ আসার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিটি ওয়ার্ডের বহির্বিভাগে সকালে বিদ্যুৎ না থাকায় টিকিটও দিতে পারেনি। এতে বহির্বিভাগের চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হয়।
চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালের জেনারেটর ব্যবস্থা থাকলেও বড় ও উচ্চ ক্ষমতার চিকিৎসা সরঞ্জাম জেনারেটরের মাধ্যমে চালানো সম্ভব নয়। ফলে জেনারেটর চালু থাকা সত্ত্বেও এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের কিছু সেবা বন্ধ রাখতে হয়। তবে জরুরি বিভাগ, আইসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবাগুলো জেনারেটরের মাধ্যমে চালু রাখা হয়েছিল। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় নিজস্ব পাওয়ার স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলেও জানান তারা।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভাগের কাজের কারণে সকালে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এ সময় জেনারেটরের মাধ্যমে আইসিইউ, জরুরি বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা হয়। তবে সব ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ দেয়া সম্ভব হয়নি। রোগীদের দুর্ভোগ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম চালু রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দ্রুত সংযোগ চালু করে। হাসপাতালের বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতেও তাদের অনুরোধ করা হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটরগুলো সচল রাখা এবং নতুন জেনারেটর সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হাসপাতালে একটি পাওয়ার স্টেশন স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের (স্টেডিয়াম) নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘স্টেডিয়াম এলাকার ফিডারে কেবলিং ও জরুরি মেরামতকাজের জন্য শনিবার সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার বিষয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল। চমেক হাসপাতালও এ ফিডারের আওতাধীন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীদের দুর্ভোগ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি জানালে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়। ফিডারগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।’










