সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি এ মহান বিজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দেশ-বিদেশে ভিন্ন নানা আয়োজনের। এদেশের লেখক-শিল্পীদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখক-শিল্পীরাও নানা আয়োজনে বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণের পাশে দাঁড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরিতে বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছেন বিদেশী লেখক-শিল্পীরা।

গতকাল রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠিত ‘‌‌ভালোবাসায় বাড়ানো হাত: মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু’ বইয়ের আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তাদের আলোচনায় এ বক্তব্য উঠে আসে। একাত্তরে মুক্তিসংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো বিদেশী লেখক শিল্পীদের স্মরণে স্বাধীনতার এ মাসে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের লেখা বইটির আলোচনা এবং লেখকের সংগ্রহে থাকা বিদেশী বন্ধুদের স্মৃতিস্মারক নিয়ে প্রদর্শনী ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বইটি সম্পর্কে আলোচনা ও স্মৃতিচারণ করেন সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, প্রাবন্ধিক ও গবেষক মফিদুল হক, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং কবি ও সাংবাদিক সাজ্জাদ শরিফ। অনুষ্ঠান শেষে মুক্তিযুদ্ধের জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন গান পরিবেশন করেন ওয়ার্দা আশরাফ।

মতিউর রহমান বলেন, ‘মার্চ ১৯৭১—বিশেষ করে ২৫, ২৬ ও ২৭ মার্চ—বাঙালির জন্য এক গভীর বেদনা ও প্রতিজ্ঞার সময়। প্রতি বছর এই সময়টা আসলে সেই সময়ের হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংস এবং শহীদদের স্মৃতি মনে পড়ে, যা জাতির চেতনায় আজও অম্লান।’ তিনি উল্লেখ করেন, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ত্যাগ, কষ্ট ও সংগ্রামের ইতিহাস, যেখানে দেশের অভ্যন্তরের মানুষের পাশাপাশি বিদেশেও ব্যাপক সমর্থন গড়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লেখক, শিল্পী, কবি ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন।

মতিউর রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন কনসার্ট, কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদেশী শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের এ অংশগ্রহণ বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরতে সহায়তা করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশীয় লেখক-শিল্পীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, যা একটি শক্তিশালী “‍সফট পাওয়ার” হিসেবে কাজ করেছে।’ মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে এ বিষয়ে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মত দেন তিনি।

এ সময় মফিদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি জাতীয় সংগ্রাম নয়, এটি ছিল একটি বৈশ্বিক মানবিক আন্দোলন, যা বিশ্বব্যাপী লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত করেছিল।’

মফিদুল হক আরো বলেন, ‘‌বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংগীত, কবিতা, চিত্রকলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে ওঠে, যা মুক্তিযুদ্ধকে একটি সর্বজনীন মানবিক আন্দোলনে রূপ দেয়। এ প্রেক্ষাপটে দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশের মতো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’

কবি ও সাংবাদিক সাজ্জাদ শরীফ বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে কবিতা পাঠ, গান ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে ওঠে। বিশেষ করে বিদেশী কবি-শিল্পীদের অংশগ্রহণ, যেমন কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান ও অনুবাদ কর্মসূচি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ববাসীর সহমর্মিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।’

অনুষ্ঠানে সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, ‘বইটি আবেগনির্ভর না হয়ে একজন সাংবাদিকের গবেষণা ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে, যা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশী শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভূমিকা একত্রভাবে উপস্থাপনের দিক থেকে এটি একটি ব্যতিক্রমী কাজ।’

তবে তিনি মনে করেন, বইটিতে বিদেশী শিল্পী-সাহিত্যিকদের অবদান বেশি গুরুত্ব পেলেও দেশীয় শিল্পীদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে এ দিকটি আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।