মিরপুর শাহ আলী থানা পেরিয়ে কিছুদূর এগোলেই গুদারাঘাট বটতলা। সেখানে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে তাকালেই চোখ আটকে যাবে নীল রঙের আটতলা একটি ভবনে। চারপাশে টিনশেড, একতলা ও দোতলা বাড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ ভবনটি সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। বাড়িটির মালিক জসিম উদ্দিন ভূইয়া মুন্নু। মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে জেলে রয়েছেন তিনি। শুধু এ বাড়িটিই নয়, পাশে আরো একটি তিনতলা বাড়ি রয়েছে তার। এছাড়া স্ত্রী ও স্বজনদের নামে জসিমের বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, মিরপুর গুদারাঘাটের ১ নম্বর রোডের ৪৩ নম্বর বাড়ি পৃত্থি ভিলার মূল ফটকে টু-লেট লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। বাসা ভাড়ার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মো. সোবহান জানান, এ বাড়িতে না, ভাড়া হবে পাশের ৪৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের শাম্মী মঞ্জিলের তিনতলায়। একই মালিকের বাড়ি হওয়ায় এখানেই সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। দুই রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া ৩ হাজার ৮০০ টাকা।
বাসা ভাড়ার আলাপ চলার মধ্যেই বাড়িতে মাঝবয়সী এক ব্যক্তি প্রবেশ করেন। রফিক নামে ওই ব্যক্তি জানান, পৃত্থি ভিলার চারতলায় ভাড়া থাকেন তিনি। উঠেছেন মাস তিনেক আগেই। বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা না হলেও নিয়মিত ভাড়া নিয়ে যান বাড়িওয়ালা জসিম উদ্দিনের গাড়িচালক সোহেল। প্রতি মাসের ১০-১২ তারিখের মধ্যে তিনি এসে ভাড়া সংগ্রহ করেন।
পৃত্থি ভিলার উল্টোদিকে বিসমিল্লাহ ফার্নিচার নামে একটি দোকান রয়েছে। সেখানে আলাপ হয় স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেনের সঙ্গে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি গুদারাঘাট বটতলা এলাকায় বসবাস করছেন। জাকির হোসেন জানান, পৃত্থি ভিলার মালিক জসিম উদ্দিন এ বাড়িতে বসবাস করতেন না। তবে মেডিকেল ও ডেন্টাল পরীক্ষার আগে আগে তাকে এলাকায় দেখা যেত। সে সময় অনেক শিক্ষার্থীর আনাগোনাও হতো তার ওই বাড়িতে। বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে এত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়ে আশপাশের মানুষের মধ্যেও কৌতূহল ছিল।
একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বছর চারেক আগে একদিন সন্ধ্যায় ২০-২৫ জন শিক্ষার্থীকে পৃত্থি ভিলার সামনে অপেক্ষা করতে দেখেছিলেন। কিছুক্ষণ পর একটি মাইক্রোবাসে করে সেখানে উপস্থিত হন জসিম উদ্দিন। গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের নিয়ে জসিম তার ৪৫ নম্বর বাড়িতে প্রবেশ করেন। পরের দিন সকালে দেখা হলে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জসিমকে প্রশ্ন করেন জাকির হোসেন। জবাবে জসিম জানান, এরা সবাই তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছে। তিনি রাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েই চলে যাবে।
বটতলার আরেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সান স্টার টেইলার্সে কথা হয় এলাকার প্রবীণতম ব্যক্তি রহিম শেখের সঙ্গে। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকে গুদারাঘাট এলাকার একটি টিনশেড বাড়িতে ভাড়ায় ওঠেন জসিম উদ্দিন। সে সময় তিনি কাজ করতেন একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে। সংসার চালাতেও বেশ হিমশিম খেতেন তিনি। ২০০০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে তার কাছে শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন জসিম। বছর পাঁচেকের মাথায় গুদারাঘাট বটতলায় ৪ শতাংশ জমি কেনেন। বছর দুয়েক পর পাশের আরো ৪ শতক জমি কিনে নেন তিনি। কিছুদিন পর উল্টোদিকের আরো একটি প্লট বোনকে কিনে দেন জসিম। এ সময়ের মধ্যে তিনি বাড়ির কাজও শুরু করেন। বেশ দ্রুত আটতলা বাড়ির কাজ শেষ করেন তিনি। এরপর পাশের প্লটটিতে আরেকটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করেন। তবে ২০১১ সালে এ ভবনের নির্মাণকাজ চলাকালে জসিমকে নিয়ে যায় র্যাব। সে সময় জানা যায়, তার বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এরপর তিনি ছাড়াও পান। ২০১৫ সালে আরো একবার গ্রেফতার হন ও ছাড়া পান। তার বাড়িতে আগের মতোই শিক্ষার্থীদের আনাগোনা দেখা গিয়েছিল সে সময়।
সিআইডির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জসিম উদ্দিন গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার জয়মন্ডপ ইউনিয়নের খানবানিয়ারা গ্রামে। জসিমের খালাতো ভাই সালাম চাকরি করতেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর ছাপাখানায় মেশিনম্যান হিসেবে। এ ভাইয়ের সূত্র ধরে ছাপাখানায় তার যাতায়াত ছিল। সেখান থেকেই একপর্যায়ে দুই ভাই মিলে প্রশ্নফাঁসের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। জসিম তার সহকর্মীদেরও এ প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থী জোগাড় করতেন।
গত ১৯ ও ২০ জুলাই রাজধানীর মিরপুর থেকে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতারের পর সিআইডি জানায়, এ চক্রের মূল হোতা জসিম। অন্য চারজন হলেন সানোয়ার হোসেন, মোহাইমিনুল ওরফে বাঁধন এবং জসিমের ছোট বোনের স্বামী জাকির হোসেন দিপু ও ভাতিজা পারভেজ খান। এ সময় জসিমের কাছ থেকে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার চেক এবং পারভেজের কাছ থেকে ৮৪ লাখ টাকার চেক উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার পাঁচজনসহ পলাতক নয়জনকে আসামি করে গত ২০ জুলাই মামলা করে সিআইডি। এ মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের আরো ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। জসিম এর আগের দিন রাতে চক্রের সদস্য সানোয়ারকে মিরপুর ২ নম্বরের প্রশিকার মোড়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন সরবরাহ করেন। এ প্রশ্ন জসিম সংগ্রহ করেছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেসের মেশিনম্যান সালামের কাছ থেকে। জসিমের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র পেয়ে সানোয়ার মোবাইল ফোনে সেটির ছবি তুলে অন্য সদস্যদের মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দেন। ২০১৮ সাল পর্যন্ত একইভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নফাঁস বা বিক্রি করা হয়।
প্রতি বছর পরীক্ষা শুরুর আগে সানোয়ার ও জাকির হোসেন ওরফে দিপুসহ চক্রের সদস্যরা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তাদের ভোটার আইডি কার্ড, প্রবেশপত্রের ফটোকপি, যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন নম্বর জোগাড় করতেন। এসব তথ্য জসিমের মিরপুরের বাসায় পৌঁছে দেয়া হতো। পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা নগদ টাকা ও চেকও পৌঁছে দেয়া হয় জসিমকে। পরীক্ষার আগের দিন রাতে ফাঁস করা প্রশ্নপত্র সামিউল জাফর ওরফে সিটু পৌঁছে দিতেন জসিমের স্ত্রী শিল্পীকে। পরে শিল্পী তা অন্য সদস্যদের কাছে সরবরাহ করতেন।
মেডিকেল ও ডেন্টাল পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এ চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সিআইডি। সংস্থাটির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, প্রশ্নফাঁসের এ চক্রের সব সদস্যের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে চক্রের হোতা জসিমের বেশকিছু সম্পদের তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। তদন্ত শেষে এসব অবৈধ সম্পদ জব্দের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।










