হাওরভর্তি ধান। ভালো করে পাকেনি। পাকতে আরো সময় লাগবে ১০ থেকে ১৫ দিন। কিন্তু উজানের ঢলে এরই মধ্যে ফসল রক্ষাবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে হাওরে। তলিয়ে গেছে অনেক জমি। তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান, যা দু-একদিনের মধ্যে না কাটলে পানিতে ডুবে যাবে। এ অবস্থায় কাঁচা ও আধাপাকা ধান অনেকে কেটে ঘরে তুললেও ঘুম নেই হাওরের কৃষকের। একদিকে লোকসান গোনা, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা চেপে বসেছে তাদের। কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আগামী কয়েকদিনে বৃষ্টি কমে আসবে। বাড়বে রোদ।

দ্রুত ধান কাটতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেক কৃষক। শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেকার হাওরের কৃষক আবদুল কাদির বলেন, শ্রমিক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে ধানকাটা। শ্রমিক না পাওয়ায় নিজেদের আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিজেরাই কোমর পানিতে ধান কাটছি। ঋণ করে এবার বোরো ধান চাষ করছিলাম কিন্তু পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। পানির তল থেকে জমির ধান কেটেও কোনো লাভ হবে কিনা বুঝতেছি না। তবু মনকে বুঝ দেয়ার জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছি।

তিনি জানান, প্রতিদিনই হাওরে পানি বাড়ছে। বিভিন্ন হাওরের ধান তলিয়ে গেছে। দুশ্চিন্তায় হাওরে ধান রেখে ঘুম হয় না।

হাওরের কৃষকরা জানান, জেলাজুড়ে একদিকে চলছে ধান কাটার ধুম, অন্যদিকে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা। হাওরাঞ্চলে কৃষককে বাঁধে এবং ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, এ পর্যন্ত ৯৮ হাজার ৪০০ হেক্টরের বোরো ধান কাটা হয়ে গেছে। মোট আবাদি জমির ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ভারী বৃষ্টি না হওয়ায় সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি কিছুটা কমেছে। জেলার প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি কমলেও হাওরাঞ্চলে পানির বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। হাওরাঞ্চলের পানি ফসল রক্ষাবাঁধ ছুঁই ছুঁই করছে। হাওরে হাওরে ফসল রক্ষাবাঁধ টেকানোর জন্য যুদ্ধ করছেন কৃষকরা। অনেক বাঁধে ফাটল, ছিদ্র ও ধস ঠেকাতে লড়াই করছেন তারা। সবসময় নজর রাখতে হচ্ছে বাঁধের দিকে। উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্য দিয়ে গত কয়েকদিন ধান কাটছেন কৃষক। কৃষকদের দুশ্চিন্তার মধ্যে স্বস্তির খবর দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ জানিয়েছেন, আবহাওয়া ভালোর দিকে যাচ্ছে। শুক্রবার থেকে উজানে ও সুনামগঞ্জে বৃষ্টি কমে যাবে। বরাক উপত্যকায় ৭০ থেকে ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। সারা দেশে বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ায় সুনামগঞ্জ শঙ্কামুক্ত হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, নদ-নদীর পানি কমেছে। যেহেতু নদীর পানি হাওরে নামছে, তাই এখনো ঝুঁকিতে ধর্মপাশা, মধ্যনগর, দিরাই, শান্তিগঞ্জ, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও শাল্লা উপজেলায় অর্ধশত হাওর রক্ষাবাঁধ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আগামী এক সপ্তাহ পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি হবে না। ফলে কৃষক এ সময়ের মধ্যে বাকি ধান গোলায় তুলে নিতে পারবেন। হাওরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির এখনো কোনো উন্নতি হয়নি। নদ-নদী থেকে পানি হাওরের দিকে নামছে। হাওরাঞ্চল এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুসারে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পানি সমতলে রয়েছে। তবে পানি কোথাও কোথাও কমেছে। আর সুরমা ও যাদুকাটা নদীর পানি বিপত্সীমার ৩৯ ও ৬৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো বৃষ্টি হয়নি। এ সময় সুনামগঞ্জে ছয় মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এ অবস্থা থাকলে আমরা আশা করছি হাওরগুলোর ধান কৃষক কেটে নিতে পারবেন।

জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বাঁধের ফাটল বা ধস ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সতর্কাবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয়দের নিয়ে তা মোকাবেলা করতে বলা হয়েছে এবং তারা তাই করে যাচ্ছে। যেসব হাওরের বাঁধে ফাটল, ছিদ্র ও ধস দেখা দিয়েছে ওইসব বাঁধে সংস্কারকাজ চলছে বলেও জানান তিনি।