চরম আকার ধারণ করেছে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি। টাইগ্রের বিদ্রোহী আঞ্চলিক বাহিনী এরই মধ্যে রাজধানী আদ্দিস আবাবার কাছাকাছি চলে এসেছে। যদিও এ গৃহযুদ্ধ এখনই শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। চলমান এ গৃহযুদ্ধ বিপদে ফেলে দিয়েছে ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসা বিদেশী উদ্যোক্তাদের। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দূরের কথা, দেশটিতে বিনিয়োগকৃত পুঁজি উঠিয়ে আনা নিয়েই বড় ধরনের শঙ্কায় রয়েছে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো। এমন প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশের ডিবিএল গ্রুপেরও।
একসময় দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে আফ্রিকার সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠেছিল ইথিওপিয়া। ২০১০ থেকে গত বছর পর্যন্ত গড়ে বার্ষিক ৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল দেশটি। নানা জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দেশ ইথিওপিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ উঠছে বহু বছর ধরে। তার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাপক সহযোগিতা পেয়েছে দেশটি। শিল্প ও বাণিজ্য খাতে নানা সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে দেশটিকে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছিল। এছাড়া বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে ছিল সস্তা শ্রম ও জমির দাম।
গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত রফতানির সুবিধা পেতে বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা এসে ভিড় জমিয়েছেন ইথিওপিয়ায়। ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের ক্রেতারাও এশিয়ার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগের আহ্বান জানাতে থাকে। এমনই এক আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশটিতে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপ। যদিও এর কয়েক বছরের মধ্যেই ইথিওপিয়ার পরিস্থিতি ব্যবসা চালানোর জন্য পুরোপুরি প্রতিকূল হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, ডিবিএল গ্রুপের অন্যতম বড় ক্রেতা সুইডেনভিত্তিক এইচঅ্যান্ডএম। এ প্রতিষ্ঠানের তাগিদেই ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডিবিএল কর্ণধাররা। ইথিওপিয়ায় পোশাক উৎপাদন করে মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করে নেয়াই ছিল এইচঅ্যান্ডএম ও ডিবিএল গ্রুপের লক্ষ্য। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে দেশটি নিয়ে এ উচ্চাশা এখন প্রায় ফিকে হয়ে এসেছে।
ইথিওপিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত গত বছরের নভেম্বরে। দেশটির টাইগ্রে অঞ্চলে সামরিক অভিযানে নামে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের অনুগত বাহিনী। অভিযানের অংশ হিসেবে এলাকাটিতে ব্যাপক মাত্রায় বোমাবর্ষণও করা হয়। ওই সময়ে টাইগ্রেতে ডিবিএল গ্রুপের কারখানা চত্বরেও বোমা পড়েছিল। সে সময় বাংলাদেশী শ্রমিক-কর্মকর্তারা আটকে পড়েন। পরে কূটনৈতিক তত্পরতার মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
এর এক বছরের মাথায় বর্তমানে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি আরো তীব্রতর হয়েছে। বিপাকে পড়ে গিয়েছেন দেশটিতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগ করা বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের উদ্যোক্তারা। যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে শুরু করলেও এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে লগ্নি করা পুঁজির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে শিল্পোদ্যোক্তাদের।
পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইথিওপিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ছিল। সম্প্রতি এ সুবিধা বাতিল করেছে মার্কিন সরকার। বাইডেন প্রশাসনের এ-সংক্রান্ত ঘোষণা কার্যকর হওয়ার কথা আগামী জানুয়ারি থেকে। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে ইথিওপিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে কোনো শুল্ক দিতে হতো না। জমির দামও ছিল তুলনামূলকভাবে কম। শ্রমও সস্তা। মূলত এসব বিষয় নিয়েই পশ্চিমাদের প্রচারণা ও প্ররোচনায় দক্ষিণ এশিয়াসহ আফ্রিকার বাইরে থেকে অনেক বিনিয়োগকারী সেখানে ব্যবসা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ডিবিএল গ্রুপও।
দেশটিকে নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের একসময়কার উচ্ছ্বাস এখন রূপ নিয়েছে নিন্দা ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপে। ইথিওপিয়াকে দেয়া বাজেট সহায়তাসহ বাণিজ্য সুবিধাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে একের পর এক। অন্যদিকে বিদ্রোহীরা এরই মধ্যে রাজধানী আদ্দিস আবাবার কাছাকাছি চলে এসেছে। প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সহায়তা নিয়ে পাল্টা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। পশ্চিমাদের আশীর্বাদবঞ্চিত হয়ে ঝুঁকেছেন ইরান, রাশিয়া ও চীনের দিকে। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেশটির গৃহযুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। চলমান সংকট থেকে বিনিয়োগকারীদের সহসা পরিত্রাণেরও কোনো পথ দেখতে পাচ্ছেন না তারা।
ইথিওপিয়ায় ডিবিএল গ্রুপের কারখানাটি গড়ে উঠেছে মোট ৭৮ হেক্টর জমির ওপর। শুরুতে এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। পরে ১০ কোটি ডলারের মতো বিনিয়োগ করা হয়। মোট তিনটি উৎস থেকে প্রকল্পের অর্থ জোগান নিশ্চিত করা হয়। এর মধ্যে ডিবিএল গ্রুপের নিজস্ব তহবিলসহ সুইডিশ সুইডফান্ড ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ইথিওপিয়ার অর্থায়নও ছিল।
দেশটিতে বিনিয়োগ করা নিয়ে শুরু থেকেই প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে ডিবিএল গ্রুপকে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও দক্ষ জনশক্তির ঘাটতির মতো সমস্যারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে উৎপাদনে আসার পরিকল্পনাও পিছিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া ইথিওপিয়ায় বস্ত্র ও পোশাক খাতের বিদ্যমান সক্ষমতা ও দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তিকে বিবেচনায় নিয়ে দেশটিতে ডিবিএল গ্রুপের বিনিয়োগের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন বাংলাদেশের অনেক উদ্যোক্তা।
ইথিওপিয়ায় পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা সংযোগ শিল্পের কিছুটা সক্ষমতা থাকলেও তা বাংলাদেশের তুলনায় খুবই সামান্য। বাংলাদেশের বার্ষিক সুতা উৎপাদনক্ষমতা ২৪০ কোটি কেজির বেশি। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার বার্ষিক সুতা উৎপাদনক্ষমতা প্রায় সোয়া ৭ কোটি কেজি। দেশের বার্ষিক ওভেন কাপড় উৎপাদন সক্ষমতাও ইথিওপিয়ার ২০ গুণেরও অনেক বেশি। ইথিওপিয়ায় বস্ত্র ও পোশাক কারখানা আছে প্রায় দেড়শটি। বাংলাদেশে শুধু সক্রিয় পোশাক কারখানাই আছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার।
এছাড়া বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদেশে অবাধে বিনিয়োগেরও সুযোগ নেই। এ বিষয়ে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও। ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, দেশের বাইরে পুঁজি স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে বিশেষ অনুমোদন সাপেক্ষে ও কেস টু কেস ভিত্তিতে। এ নীতি অনুসরণ করেই ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বাইরে বিনিয়োগের অনুমোদন পায় ডিবিএল গ্রুপ। বিনিয়োগের জন্য এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটা হিসাবের অর্থ ব্যবহারেরও অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। এ-সংক্রান্ত সব প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালে ইথিওপিয়ায় উৎপাদন শুরু করে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের কারখানা। এর দুই বছর পেরুতে না পেরুতেই সেখানকার কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বণিক বার্তাকে বলেন, ক্রেতা প্র্রতিষ্ঠান ও ম্যাকেঞ্জির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আফ্রিকাকে নেক্সট ফ্রন্টিয়ার বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো অঞ্চলটির কিছু দেশ ছাড়া অধিকাংশেরই বড় ধরনের রফতানি নেই। এক্ষেত্রে তাদের প্রস্তুতিও খুব তাত্পর্যপূর্ণ নয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইথিওপিয়ার শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। এতে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও লাভবান হবে। আবার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওখানকার বিনিয়োগ আটকে রয়েছে। যারাই দেশটিতে কারখানা করেছে, তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশসহ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও শ্রীলংকার বিনিয়োগ আছে ইথিওপিয়ায়। দেশটি এখনো ওয়ারজোন। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে যদি উন্মুক্ত হয়, তাহলে দেশটি অবশ্যই ভালো বিনিয়োগকারী ও ব্র্যান্ড ক্রেতা খুঁজবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনে এমন ক্রেতাদের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত সম্পর্কও বেশ ভালো। ফলে নিশ্চিতভাবেই আমরা আবার সেখানে যাব। আমরা প্রস্তুত আছি। দরকষাকষির প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থানও বেশ শক্তিশালী। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো প্রকল্পটিতে দেশটির নিজস্ব বিনিয়োগই অনেক বেশি। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সভরিন ফান্ডও আছে। ফলে তারাও সম্পৃক্ত আছে। এজন্য আমরা একজোট আছি। ফলে আমরা দেখছি, আমাদের বিনিয়োগ একভাবে সুরক্ষিতই আছে। আমরা এমনটাই বিশ্বাস করি। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।










