দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী বাছাই করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে ভোটে যাওয়ার কথা জানালেও ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দলটি। এরই মধ্যে একটা বড় অংশের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আজকের বৈঠকের পরই প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। একাধিক সূত্র বলছে, গত দেড় দশকের প্রভাবশালী কিছু আমলা এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন। সেই দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাদেরও কেউ কেউ।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনের মনোনয়নে রাজনীতিকদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত জনসম্পৃক্ত কর্মকর্তাদেরও প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। দলের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজনকে আগেই সবুজ সংকেত দেয়া হয়। ফলে অবসরের পরই নিজেদের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত করেন। এর মধ্যে আমলার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যারা রাজনীতিতে আসার আগ্রহ দেখিয়েছেন তাদেরও স্বাগত জানানো হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, যেসব সরকারি কর্মকর্তা চাকরি থেকে কমপক্ষে তিন বছর আগে অবসরে গেছেন, কেবল তারাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তাই তিন বছর আগে অবসরে যাওয়া আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকে যেমন মনোনয়নের প্রত্যাশা করছেন, তেমনি তারও আগে অবসর নেয়া কর্মকর্তারাও রয়েছেন ভোটের মাঠে।
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৩ হাজার ৩৬২ জন, যাদের মধ্যে বেশকিছু সাবেক আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তা আছেন। প্রার্থী বাছাইয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে বৈঠক করেছে দলটির সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড। প্রথম দিন রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। শুক্রবার বাছাই করা হয়েছে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের প্রার্থী। গতকাল চট্টগ্রাম বিভাগের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয় বলে জানিয়েছেন দলের দায়িত্বশীলরা। বিকাল ৪টায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সবার নাম একসঙ্গে ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান। তবে নাম ঘোষণার আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে আজ সকাল ১০টায় গণভবনে মতবিনিময় করবেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা ও সেনা কর্মকর্তাদের অন্তত পাঁচজনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে। হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত পেয়েই তারা দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করেছি। ওই অভিজ্ঞতাটা আরো কাজে লাগাতে চাই। বিষয়টি আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানলে আমাকে সবুজ সংকেত দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আমি আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করি।’
নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী এ আমলা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসডিজিবিষয়ক (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) সমন্বয়কেরও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় তার গ্রামের বাড়ি। মাদারগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। প্রভাবশালী এ নেতার আসনে টিকিট পাওয়া সম্ভব হবে না জেনে আবুল কালাম আজাদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন জামালপুর-৫ থেকে। সদর উপজেলার সংসদীয় আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য মোজাফফর হোসেন।
জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছি। রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রমে শামিল হতে চাই। কারণ এটি একটি ভালো কাজ। দেশের কল্যাণের জন্যই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছি, আগামীতেও থাকব।’
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব ও সরকারি কর্ম-কমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিকও। সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৪ আসনে তিনি এবার নৌকার মাঝি হতে চান। গত নির্বাচনে এ আসনটি জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ওইবার বিএনপি প্রার্থী ফজলুল হক আসপিয়াকে হারিয়ে জয় পান দলটির প্রার্থী অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। এবার জাপা ৩০০ আসনেই এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে। তাই এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মোহাম্মদ সাদিকের টিকিট অনেকটাই নিশ্চিত বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সরকারি আমলা থেকে রাজনীতির মাঠে আসার বিষয়ে মোহাম্মদ সাদিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি রাজনীতিতে নতুন। আমার লক্ষ্য সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে থাকা। খুব বড় কিছু করতে পারব সেটা আমি মনে করি না। আমি চাকরি জীবনে সততার সঙ্গে কাজ করেছি। জনস্বার্থে কাজের শপথ নিয়ে কাজ করেছি। এখন দলের (আওয়ামী লীগ) আনুগত্য নিয়েছি, সেই আনুগত্য বজায় রেখে কাজ করব।’
জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাজ করেছেন সাজ্জাদুল হাসান। অবসর নেয়ার পর ছিলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান। এরপর তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। কয়েক মাস আগে নেত্রকোনা-৪ (মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী) সংসদীয় আসনে উপনির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সংসদ সদস্য হন। এবারের নির্বাচনেও তার মনোনয়ন নিশ্চিত বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে সাবেক আমলাদের মধ্যে আরো অনেকেই ভোটে লড়তে চান। এর মধ্যে খুলনা-১ আসনে সাবেক সচিব ড. প্রশান্ত কুমার রায়, ভোলা-৪ আসনে সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিন, নওগাঁ-৩ আসনে সাবেক সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, চাঁদপুর-১ আসনে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব গোলাম হোসেন, চাঁদপুর-৫ আসনে সাবেক সচিব শাহ কামাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে সাবেক সচিব জিল্লার রহমান এবং বরগুনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন সাবেক সচিব মিহির কান্তি মজুমদার।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে শরীয়তপুর-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক। পুলিশপ্রধান হিসেবে তিনি ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব সামলিয়েছেন। কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসন থেকে মনোনয়ন দৌড়ে আছেন সাবেক দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এর মধ্যে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বর্তমান সংসদ সদস্য। এ আসনে মনোনয়ন চাইছেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) কাহার আকন্দও। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেলহত্যা মামলা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ মামলাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি বেশ আলোচিত। আর সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান নৌকার মনোনয়ন চান জামালপুর থেকে।
এছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক আবুল হোসেন পটুয়াখালী-৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। চট্টগ্রাম-১০ আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম।
সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে আসাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে ক্ষমতাসীনরা। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী দল আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবাই এ দলে যুক্ত হতে পারেন। সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগে যুক্ত হয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন, তাতে দোষের কিছু দেখি না। তারা তো মানুষের কল্যাণের জন্যই রাজনীতিতে এসেছেন। তবে আমাদের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে। বোর্ড যদি যোগ্য মনে করে তাহলে তারা মনোনয়ন পাবেন, না হলে পাবেন না।’
আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্তের বিষয়ে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রার্থী বাছাই চলছে। যারা যোগ্য ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য তারাই মনোনয়ন পাবেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী তাদেরকে আওয়ামী লীগ সব সময়ই স্বাগত জানায়। চাকরি থেকে যারা অবসর নেন তারাও যুক্ত হতে পারেন। এতে অসুবিধা নেই।’










