বন্যার পানি নেমে গেছে বেশ আগে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোও প্রস্তুত পর্যটক বরণে। তবু কাঙ্ক্ষিত পর্যটক সমাগম ঘটছে না সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলোয়। খাঁ-খাঁ করছে দুই শতাধিক হোটেল-মোটেল। প্রতিদিন এ খাতে ক্ষতি হচ্ছে শতকোটি টাকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যা সাময়িক হলেও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রভাব পড়েছে সিলেটের পর্যটন শিল্পে। ফলে ঈদুল আজহার ভরা মৌসুমেও পর্যটক পায়নি ‘প্রকৃতিকন্যা সিলেট’। সুদিন ফেরার অপেক্ষায় সিলেটের পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাচুর্যভরা সিলেট। চা বাগান, জলাবন, পাথুরে নদী, পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা ঝরনা, দিগন্তবিস্তৃত নীল জলরাশি হাওরসহ বিভাগজুড়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব পর্যটন কেন্দ্র। প্রকৃতিকে কাছে থেকে দেখার মতো রয়েছে বহু পর্যটন স্পট। পর্যটনের এ ভরা মৌসুমে সিলেটে বাগড়া দেয় দফায় দফায় বন্যা। করোনার পর পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পর্যটকের ঢল নামে সিলেটে। চলতি বছরের মে-জুনে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে সিলেট। এর পরই ধস নামে সিলেটের পর্যটন শিল্পে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী ১১ মে থেকে প্রথম দফা বন্যার ভয়াবহ কবলে পড়ে সিলেট। স্থায়িত্ব ছিল ২২ মে পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফা বন্যায় লণ্ডভণ্ড করে দেয় সিলেট ও সুনামগঞ্জকে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের ৯০ ভাগ এলাকা বন্যাকবলিত। সিলেটের ১৩ উপজেলার সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। এ বন্যা স্থায়ী ছিল ১৪-২৫ জুন পর্যন্ত। কুশিয়ারা বেল্টের তিনটি উপজেলার কিছু কিছু এলাকা এখনো পানিতে নিমজ্জিত। রাস্তাঘাট, কৃষি, মৎস্যসহ সব খাতের ক্ষতি করে এ বন্যা। গৃহহীন হয়ে পড়েছে ৪০ হাজার মানুষ। পর্যটন কেন্দ্রগুলোও ছিল পানিতে নিমজ্জিত। পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে পর্যটনসংশ্লিষ্টরা ব্যবসার আশা করলেও প্রত্যশা পূরণ হয়নি তাদের। উল্টো ভরা মৌসুমেও খরা গেছে পর্যটন শিল্পের। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হয়েছে শতকোটি টাকার। এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সিলেটের এ শিল্প।
সিলেট হোটেল, মোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এটিএম শোয়েব। তার মতে, এবারের বন্যার ভয়াবহতার কারণেও অনেক পর্যটক সিলেট আসতে চাননি। আবার পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর পর্যটকরা অনেকটা বরিশাল-কুয়াকাটামুখী। এ দুই কারণে মূলত এবার সিলেটে পর্যটকের সংখ্যা কম।
সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি এটিএম শোয়েব আরো বলেন, পর্যটনের সঙ্গে কেবল হোটেল নয়, অনেক বিষয় জড়িত। এর সঙ্গে পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল ও নৌকার বিষয়টিও জড়িত। অর্থাৎ পর্যটকরা যেদিকে যাবেন, সেদিকে আর্থিক বিষয় সম্পৃক্ত। পর্যটক না আসায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে বলে জানান এ ব্যবসায়ী। প্রতিদিন এ খাতের ব্যবসায়ীরা শতকোটি টাকার ক্ষতি গুনছেন বলে জানান তিনি।
সিলেট নগরীর ফরচুন গার্ডেনের এমডি সুমাইয়াত নুরী জুয়েল জানান, ঈদুল আজহার সময় তার হোটেলে কোনো গেস্ট আসেননি। হোটেলের রুম বুকিং ছিল একেবারে নীল। ঈদ মৌসুমে এ রকম অবস্থা আগে কখনো হয়নি। তিনি বলেন, ঈদের বেশ ক’দিন চলে গেছে। বন্যার পানি নেমে গেছে, এর পরও দেখা মিলছে না পর্যটকের। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো আমাদের পথে বসতে হবে।
সিলেটের প্রধানতম পাথর কোয়ারি রয়েছে কোম্পানীগঞ্জে। সেখানে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিয়ে মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা সাদা পাথর নামক জায়গাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যেখানে বিনোদনের উদ্দেশ্যে ভিড় জমায়। বন্যা-পরবর্তী সাড়া নেই সেখানে।
কোম্পানীগঞ্জ ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি আবিদুর রহমান জানান, বন্যা পর্যটনের অনেক ক্ষতি করে গেছে। পানি নেমে গেছে কিন্তু পর্যটকের দেখা মিলছে না। দোকানপাট ঘুচিয়ে পর্যটকের অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা। ঈদেও ছিল না পর্যটকের উপস্থিতি। তিনি মনে করেন, এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে জোর প্রচারণা চালাতে হবে।
সিলেট নগরীঘেঁষা পর্যটন কেন্দ্র এশিয়ার অন্যতম জলাবন রাতারগুল। ভরা মৌসুম হলেও এখনো পর্যটকের আনাগোনা বাড়েনি। শুধু রাতারগুলো নয় বন্যার কারণে পুরো পর্যটন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সিলেট ট্যুরিজম ক্লাবের সভাপতি হুমায়ুন কবীর লিটন বলেন, বন্যায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর যাতায়াতের রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দ্রুততম সময়ে রাস্তাঘাট সংস্কার করে দেয়া প্রয়োজন। না হয় অনেক পর্যটন কেন্দ্র পর্যটক হারাবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, বন্যার কারণে শিল্প বাণিজ্যের সব খাতে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতি হয়েছে। এখন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যটন কেন্দ্রগুলো আবার মুখর হয়ে উঠবে।










