খুলনা নগরের শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি। যৌথভাবে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান লিমিটেড ও মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। প্রকল্পের আওতায় সড়ক সংস্কার, লবণচরা সেতু ও মতিয়াখালী স্লুইসগেট নির্মাণ করা হবে। তবে সাড়ে তিন বছরেরও অধিক সময়ে কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে ৭০ শতাংশ। এরই মধ্যে বিল উত্তোলন করে লাপত্তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সড়ক সংস্কারকাজ দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখায় ৭ আগস্ট চুক্তিও বাতিল হয়েছে। আবার কবে কাজ শুরু হবে তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ঠিকাদার সড়কের দুই পাশ খনন করে ফেলে রেখেছেন। এতে দুই পাশের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে রয়েছে।
লবণচরা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনামুল কবির বলেন, ‘শুধু সড়কের কারণে অসংখ্য ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নির্মাণকাজে গতি ছিল না কখনই। কাজ শুরুর প্রথম দিকে ঠিকাদার সড়কের দুই পাশে খাল কেটে ফেলে রেখেছিলেন দেড় বছর। তখন থেকে অনেকে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।’
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘নগরের রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে খানজাহান আলী (রূপসা) সেতু পর্যন্ত শিপইয়ার্ড সড়কটি বেহাল প্রায় এক যুগ ধরে। এখন নির্মাণকাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সড়কটির কারণে প্রায় এক যুগ ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পথচারী ও এলাকাবাসী। এটি ২০১৩ সাল পর্যন্ত খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০১৩ সালের ৭ মে সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের জন্য একনেকে প্রকল্প অনুমোদন করায় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) অধীনে চলে যায়। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ের নয় বছর পর কাজ শুরু করে কেডিএ।
প্রকল্প পরিচালক ও কেডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরমান হোসেন বলেন, ‘সড়কের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রেখেছিলেন ঠিকাদার। গৃহায়ন উপদেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দিলেও তারা শোনেননি। এজন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। তাদের জামানতের ১২ কোটি টাকাও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।’
কেডিএ সূত্রে জানা গেছে, শিপইয়ার্ড রোড প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৩ সালের জুলাইয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। আতাউর রহমান লিমিটেড ও মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডকে যৌথভাবে কার্যাদেশ দেয় কেডিএ। ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০১৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজই শুরু করতে পারেনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা। ফলে প্রথম দফায় এক বছর ও দ্বিতীয় দফায় দুই বছর সময় বাড়িয়ে ২০১৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সেই লক্ষ্যও পূরণ না হওয়ায় পরে নতুন করে তৃতীয় দফায় এক বছর, চতুর্থবার প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে তিন বছর, পঞ্চম দফায় দুই বছর, ষষ্ঠ ধাপে ছয় মাস ও সপ্তম দফায় ছয় মাস মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের জুনে। তবে সপ্তম মেয়াদে কাজের ভৌত অগ্রগতি হয় ৭০ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ করতে অষ্টম ধাপে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরের প্রকল্পের মেয়াদ গিয়ে ঠেকেছে এক যুগে। মেয়াদের পাশাপাশি প্রকল্পটির ব্যয়ও বেড়েছে দফায় দফায়। প্রথমবার ২৮ কোটি টাকা বাড়ানো হলেও দ্বিতীয়বারে বাড়ানো হয়েছে ১৩২ কোটি। এতে ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্পের ব্যয় এসে দাঁড়ায় ২৫৯ কোটি টাকায়। পরে অবশ্য ব্যয় কিছুটা কমিয়ে ২৫৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ১১১ কোটি টাকা। বাকি ১৪৩ কোটি টাকা অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়। এখনো সড়কে বেজ টাইপ-১ (পাথরের স্তর), এসফল্ট (কার্পেটিং), ব্রিজ, ডিভাইডার ও স্ট্রিট লাইট স্থাপন বাকি রয়েছে। প্রকল্পে ৩ দশমিক ৭৭৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি চার লেনে প্রশস্ত করে পুনর্নির্মাণ, দুই পাশে ড্রেন ও ফুটপাত, সড়কের মাঝে দশমিক ৯২ মিটার ডিভাইডার নির্মাণ, লবণচরায় ৬৬ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ এবং মতিয়াখালীতে স্লুইসগেট ও কালভার্ট নির্মাণের কথা। তবে অর্ধেকের বেশি কাজ এখনো বাকি। এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। একই অবস্থা লবণচরা সেতুর। ৬৬ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর পাইলিং শেষ হলেও ১০টি গার্ডারের মধ্যে মাত্র একটির কাজ হয়েছে। মতিয়াখালীতে দুই স্তরের স্লুইসগেটের মধ্যে এক স্তর শেষ হয়েছে। অন্য স্তর স্থাপন না করায় জোয়ারের সময় ওই গেট দিয়ে শহরের ভেতরে পানি প্রবেশ করছে।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান লিমিটেড ও মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. আশরাফ আলী দাবি করেন, একনেকে ২০১৩ সালে সড়কটির নির্মাণকাজের অনুমোদন দেয়া হলেও ২০২২ সালের জানুয়ারিতে কার্যাদেশ দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনসহ বিভিন্ন কারণে কাজে ধীরগতি দেখা দেয়।
আশরাফ আলী বলেন, ‘যেহেতু আমাদের সঙ্গে কার্যাদেশের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে, সে কারণে প্রকল্প এলাকায় থাকা মালামাল ও যন্ত্রপাতি ফেরত পেতে আমরা মামলা করেছি।’
সার্বিক বিষয়ে কেডিএর উপপরিচালক ও গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইজাদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঠিকাদার কাজে গাফিলতি ও বিলম্ব করায় এবং কর্মপরিকল্পনা মোতাবেক কাজ না করায় বিভিন্ন সময়ে ১৪টি সতর্কতা চিঠি দেয়া হয়। এরপর তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর অবশিষ্ট কাজের জন্য ২৪ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর দরপত্র খোলা ও অনুমোদন করে পুনরায় কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’










