ব্যবসায়িক কৌশলের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসার আয় ও মুনাফায় ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুনাম রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর। ফলে বিশ্বজুড়েই বহুজাতিকদের ব্যবসা বছরের পর বছর ধরে দাপটের সঙ্গে টিকে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখিতা ব্যবসায়িকভাবে চাপে ফেলে দিয়েছে বহুজাতিকদের। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। কারো কারো ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিও হয়েছে এ সময়।
দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানির সংখ্যা ১৩। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশের ১৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং জুতা প্রস্তুতকারক বাটা সুর ব্যবসা থেকে আয় বেড়েছে ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তাছাড়া এ বছরের এপ্রিল থেকে জুন সময়ে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের আয় বেড়েছে ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ তিন কোম্পানি ছাড়া তালিকাভুক্ত বাকি ১০ বহুজাতিকের মধ্যে এ বছরের প্রথমার্ধে দুটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমে গিয়েছে। বাকি আটটির আয়ে একক সংখ্যার প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা সচরাচর দেখা যায় না।
সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের আয় আগের বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথমার্ধে ৩ শতাংশ কমে ৯৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যেখানে এক বছর আগে একই সময়ে কোম্পানিটির আয় হয়েছিল ৯৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথমার্ধে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশকে লোকসান গুনতে হয়েছে ২০ কোটি টাকা। অথচ আগের বছর একই সময়ে ৬৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল কোম্পানিটির।
বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, পণ্য জাহাজীকরণের উচ্চব্যয়, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং পূর্বনির্ধারিত কারখানার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ব্যয় বাড়ার কারণে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশকে এ বছরের প্রথমার্ধে লোকসানে পড়তে হয়েছে।
সিমেন্ট খাতের আরেক বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেডের বিক্রি ও নিট মুনাফা দুটোই বেড়েছে। এর মধ্যে চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে ২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির করপরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২১৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২১৫ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ১ শতাংশ।
কোম্পানির আর্থিক ফলাফল সম্পর্কে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাজেশ সুরানা বৈশ্বিক পরিবহন ও সিমেন্টের কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতেও তৎপরতা, ব্যয়সংকোচন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে কোম্পানিটি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া ও সুদের হার বৃদ্ধির কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি কভিড-১৯ ও সম্প্রতি দেশের বেশকিছু স্থানে বন্যার প্রভাবও পড়েছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স উৎপাদক সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড। এসব কারণে এ বছরের প্রথমার্ধে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি বাড়লেও নিট মুনাফা অর্ধেকে নেমেছে কোম্পানিটির।
চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ৯২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এক বছর আগের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে সিঙ্গার বাংলাদেশের করপরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২৩ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ৪৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ৫০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
জানতে চাইলে সিঙ্গার বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব কাজী আশিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, পণ্য জাহাজীকরণে ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার কারণে কোম্পানির ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে। এর সঙ্গে কাঁচামাল ও ডলারের দাম বাড়ার প্রভাব তো রয়েছেই। এসবের কারণে পণ্যের দাম বাড়ানো প্রয়োজন হলেও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় ব্যয় অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে এটিও কোম্পানির আর্থিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের (বিএটিবিসি) আয় ও করপরবর্তী নিট মুনাফা দুটিই বেড়েছে। এ বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছে ১৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় ছিল ১৮ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। প্রথমার্ধে কোম্পানিটির করপরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৯১৪ কোটি টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ৮৬২ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের বিক্রি এ বছরের প্রথমার্ধে এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি এ সময়ে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালন ব্যয় সামলানো, করপোরেট কর হ্রাস ও আগের দায়-দেনা পুনর্মূল্যায়নের কারণে প্রথমার্ধে কোম্পানিটির করপরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। এ বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ২১২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ২০৪ কোটি ২ লাখ টাকা। প্রথমার্ধে কোম্পানিটির করপরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৩৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ২২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে ছোট প্যাকেটের পণ্য কেনার প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাইরে অন্যান্য পণ্যের ভোগের পরিমাণও কমেছে। উৎস দেশে দাম বাড়ার কারণে কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পণ্য জাহাজীকরণের ব্যয়। এ খাতে ব্যয় আগের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণেও ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ও সুদের হার বৃদ্ধিসহ বেশকিছু কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ বছরের প্রথমার্ধে লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেডের আয় ও মুনাফা দুটোই কমেছে। এর মধ্যে প্রথমার্ধে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ২৫১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় ছিল ২৫২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় কমেছে দশমিক ৪১ শতাংশ। প্রথমার্ধে কোম্পানিটির করপরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৫৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে মুনাফা ছিল ৬৩ কোটি ৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ পিএলসির আয় এ বছরের প্রথমার্ধে সামান্য বাড়লেও করপরবর্তী নিট মুনাফা কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। এ বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ২৫১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ২৫০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রথমার্ধে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ২৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ২৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, কোম্পানির নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বাহ্যিক কারণে ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ডলারের বিনিময় মূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এতে কোম্পানির ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে।
এ বছরের প্রথমার্ধে টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোন লিমিটেডের আয় বাড়লেও নিট মুনাফার পরিমাণ কমে গিয়েছে। মূলত পরিচালন খাতে ১১ শতাংশ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে। চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে গ্রামীণফোনের আয় হয়েছে ৭ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৭ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এ সময় কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ৫ শতাংশ। প্রথমার্ধে কোম্পানিটির করপরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। এ সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে দশমিক ৬১ শতাংশ।
টেলিযোগাযোগ খাতের আরেক বহুজাতিক কোম্পানি রবি আজিয়াটা লিমিটেড এ বছরের প্রথমার্ধে ৪ হাজার ১২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৪ হাজার ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৮০ শতাংশ। আয় বাড়লেও এ বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটি করপরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ কমে ২৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের আয় এ বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে ৩৬৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৩৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ। এদিকে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির করপরবর্তী নিট মুনাফা এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ১০২ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।










