মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা, দক্ষ জনবল তৈরি ও সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে যশোর মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে সরকার। একই বছর ১০ সেপ্টেম্বর ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৬ সালের ৩ জুন শহরতলির হরিণার বিলে নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। প্রকল্পের আওতায় ক্যাম্পাসে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণেরও কথা রয়েছে। হাসপাতাল থেকেই ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং বিভিন্ন পদ্ধতি শেখার সুযোগ পায়। এরই মধ্যে নয়টি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হয়েছেন। অথচ গত দেড় দশকেও ক্যাম্পাসে হাসপাতাল নির্মাণ হয়নি। এতে শিক্ষার্থীরা হাতেকলমে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন না। ক্যাম্পাস থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করতে হচ্ছে তাদের।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, হাসপাতালটির নির্মাণকাজ সবে শুরু হয়েছে। এখন চলছে পাইলিংয়ের কাজ। এটি শেষ হতে কমপক্ষে ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, মেডিকেল কলেজের প্রাণ হচ্ছে হাসপাতাল। মেডিকেল কলেজটি চালু হয়েছিল ২০১০ সালে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কলেজ ক্যাম্পাসে হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়নি। তৃতীয় বর্ষ থেকে প্রতিদিন হাসপাতাল ওয়ার্ডে ব্যবহারিক ক্লাস থাকে। রোগীদের সঙ্গে সরাসরি রোগব্যাধি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন হয়। ব্যবহারিক ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা সম্ভব।
মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা দিশারী ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলাম। ৫০০ শয্যার হাসপাতাল না থাকায় আমাদের হাতেকলমে শিখন দুর্বল হয়েছে। কেননা আমরা তিন কিলোমিটার দূর থেকে এসে ২৫০ শয্যা হাসপাতাল থেকে শিখতাম। ক্লাস থাকার কারণে বেশি সময় থাকতে পারতাম না। গুরুত্বপূর্ণ রোগী থাকলেও সময়মতো আমরা তাদের পেতাম না।’
যশোর গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোর মেডিকেল কলেজের জন্য তৈরি হচ্ছে ১০ তলাবিশিষ্ট ৫০০ শয্যার হাসপাতাল। এছাড়া রয়েছে ছয় তলাবিশিষ্ট একটি নার্সিং কলেজ, নার্সদের হোস্টেল ও স্টাফ কোয়ার্টার, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ডরমিটরি ও তিন তলাবিশিষ্ট মসজিদ। শিক্ষার্থীদের হোস্টেল তিন থেকে ছয়তলায় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ছাত্রীদের হোস্টেলও দুই থেকে ছয়তলায় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ছাত্রী হোস্টেল সম্প্রসারণ শেষ হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে ছাত্র হোস্টেল হস্তান্তর হতে পারে। এছাড়া চারটি ব্লকের ১০ তলাবিশিষ্ট ৫০০ শয্যার হাসপাতালটির বেজমেন্ট হবে ১ লাখ ১০ হাজার বর্গফুট। ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ভবনে থাকবে ১৭টি লিফট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই হাসপাতাল ভবন নির্মাণে ২৪ মাসের সময় দিয়ে ২০২৪ সালে টেন্ডার হয়। ২০২৬ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের মে মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কাজটির অনুমোদন দেয়। নির্মাণকাজটি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসান অ্যান্ড সন্স। ৭০ শতাংশ নির্মাণ শেষ না হলে লিফট স্পেস হিসাব করা যাবে না। ১৭টি লিফটের জন্য ইউরোপ বা উন্নত কোনো দেশের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হবে। তাদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া ও স্থাপন সব মিলিয়ে আরো সময় লাগতে পারে। একই সময়ে মেডিকেল বর্জ্য ট্রিটমেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ থাকবে। আবার নির্মাণ শেষ হওয়ার পর যন্ত্রপাতি, আসবাবসহ জনবলের বিষয়ও রয়েছে। এসব নিশ্চিত করার পরই হাসপাতাল পুরোপুরি চালু হবে। এজন্য তিন বছরের অধিক সময়ও লাগতে পারে।
এ বিষয়ে যশোর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবে কাজ শুরু হয়েছে। পাইলিং চলছে। ইচ্ছে করলেও ২০২৬ সাল তো দূরে থাক, ২০২৭ সালেও ভবন বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না।’
মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়। প্রথমদিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে কলেজটির সব কার্যক্রম চালানো হতো। ২০১৬ সালে শহরের শংকরপুর বাস টার্মিনাল এলাকায় হরিণার বিলে ৭৫ বিঘা জমির ওপর নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয় কলেজটির কার্যক্রম। তবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে নির্মাণ হয়নি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল। যদিও যশোরের পর স্থাপিত পার্শ্ববর্তী জেলা সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়ায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হয়েছে।
যশোর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আলাউদ্দিন আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরেও ক্যাম্পাসে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ না হওয়া দুঃখজনক। হাসপাতাল না থাকায় শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে নয়টি ব্যাচের শিক্ষার্থী পাস করে বের হয়েছে।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যশোর, মাগুরা ও নড়াইল অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল। সংকট নিরসনে ২০০৬ সালে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনুমোদন দেয় সরকার। এরপর ২০০৭ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে শহরতলির হরিণার বিলে মেডিকেল কলেজের জন্য ২৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০০৮ সালে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনের মধ্যে ছয়তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৫০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ভারতের সঙ্গে একটা চুক্তির বিষয়ে কথাও হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা আর অগ্রসর হয়নি। পরে নিজস্ব অর্থায়নে হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান বলেন, ‘যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার অন্তত ২০ লাখ মানুষ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। বিগত সময়ের জনপ্রতিনিধিরা যশোরের মানুষের জন্য কোনো কাজ করেননি। এ কারণে গত ১৫ বছর আমরা ৫০০ শয্যার হাসপাতাল পায়নি।’
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হোসাইন শাফায়াত বলেন, ‘হাসপাতালে শয্যার চেয়ে কয়েক গুণ রোগী ভর্তি থাকে। আবার বহির্বিভাগেও প্রতিদিন পাঁচ-ছয় হাজার রোগী দেখা হয়। এতে চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। ৫০০ শয্যার হাসপাতাল চালু হলে আমাদের এখানে চাপ কমবে। তখন রোগীরা আরো ভালো চিকিৎসাসেবা পাবেন।’
সার্বিক বিষয়ে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আবু হাসনাত মোহম্মাদ আহসান হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থছাড় না পাওয়ায় ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণে বিলম্ব হয়েছে। তবে এখন কাজ শুরু হয়েছে।’










