রাঙ্গামাটির এক সংগ্রামী নারী ৪১ বছরের রিতা চাকমা। ছোটবেলায় হারিয়েছেন মাকে। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় পড়ালেখায় খুব বেশি এগোতে পারেননি। মাহীন সংসারের হাল ধরা, ছোট-ভাইবোনদের দেখাশোনা আর সাংসারিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই কেটেছে কৈশোর-তারুণ্য। এরপর বৈবাহিক জীবন; সেখানেও তার সংগ্রামের অন্ত নেই। ব্যক্তিগত জীবনে দুই মেয়ে ও এক পুত্রসন্তানের জননী তিনি।
জেলার নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের গ্রামের বাসিন্দা রিতা চাকমা। স্বামী প্রীতি আলো চাকমার সঙ্গে রিতা ঘর বাঁধেন ২০০৪ সালে। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার করা রিতা চাকমার বড় মেয়ে স্নাতকের ছাত্রী আর ছোট মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। একমাত্র ছেলে পড়ছে তৃতীয় শ্রেণীতে।
রিতা চাকমা বড় হয়েছেন নানিয়ারচর উপজেলার সদর ইউনিয়নের এগুজ্জাছড়ি গ্রামে। তিন বোন-এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রিতা। ১০-১২ বয়সেই মাকে হারান। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার পর আর পড়ালেখা করার সুযোগ হয়নি। বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি। পরিবারে সবার বড় হওয়ায় ভাইবোনদের দেখাশোনার দায়িত্ব, পরিবারের দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। প্রাথমিকের পর আমি আর পড়ালেখা করতে পারিনি। এখন তিন সন্তানকে পড়ালেখা করিয়ে যাচ্ছি। কারণ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।’
রিতা চাকমা জানান, ২০০৪ সালে একই উপজেলা নানিয়ারচরের ঘিলাছড়ি ইউনিয়নে তার বিয়ের পর সাংসারিক কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন হাতের কাজ করতেন। ২০১৪ সাল থেকে স্বল্প পরিসরে চালের ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে নিজেদের কৃষি জমিতে উৎপাদিত ধান ভাঙিয়ে চাল বিক্রি শুরু করেন। পরে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর চিন্তা করেন। গ্রামের মানুষের চাল কিনে এনে জেলা শহরের কল্যাণপুর বাজারে বিক্রি শুরু করেন। কল্যাণপুরে তিন বছর ব্যবসার পর ২০১৭ সাল থেকে জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র বনরূপায় হ্যাপিরমোড়ে সড়কের পাশের খোলা জায়গায় চাল বিক্রি শুরু করেন। গত সাত বছর এখানে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এ কাজে স্বামী প্রীতি আলো চাকমাও তাকে সাহায্য করেন।
গতকাল দুপুরে হ্যাপিরমোড়ে দেখা হয় রিতা চাকমার সঙ্গে। নিজের ফুটপাতের দোকানে বসে শাক বাছাই করছিলেন তিনি। তার কাছে ১০-১৫ ধরনের চাল রয়েছে। এর বেশির ভাগই পাহাড়ি বা স্থানীয় জাত হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে বিনা ১২, সিলেটি পাঞ্জা, ছক্কা পাঞ্জা, নিখিল পাঞ্জা. বিআর ২৮, লাল বিনি, কালো বিনি, সাদা বিনি, সাদা বিনি (সুগন্ধি), ভদ্র বিনিসহ নানা জাতের চাল। বিনি চাল ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। আর সাধারণ চাল ৬০-৬৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন। বাজারে চালের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে তার ব্যবসায়ও। যেখানে তিন-চার বছর আগে বিনি চাল ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতেন, সেখানে এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। তবে প্রতিদিন সমানভাবে চাল বিক্রি হয় না। কোনো দিন ১৫-২০ কেজি আবার কোনো দিন ৩০০ কেজিও বিক্রি করেন।
রিতা চাকমা বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে চালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রথম দিকে স্বল্প পরিসরে শুরু করলেও পরে গ্রামের মানুষের কাছ থেকে কিনে এনে বিক্রি শুরু করেছি। এ ব্যবসার মাধ্যমে আমি সংসারের হাল ধরে ছেলেমেয়েদেরও পড়ালেখা শেখাচ্ছি। ঘরে বসে থাকলে তো কেউ এক টাকাও দেবে না।’










