গত চার বছরে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ইলিশ আহরণ কমেছে ১৯৯ দশমিক ৫ টন। ২০১৮-২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের মধ্যে শুধু ২০২০ সালে কিছুটা বেড়েছিল ইলিশের সরবরাহ। চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত ইলিশ আহরণ হয়েছে ৩৭ দশমিক ৩ টন। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার বছরে একাধিকবার সাগর ও নদীতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও কেন বাড়ছে না তা জেলেদের বোধগম্য নয়। তাদের ধারণা, মিরসরাইয়ের চরে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ইলিশ আহরণ কমতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা নাসিম আল মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। কিন্তু মিরসরাইয়ে ইলিশ আহরণের চিত্র হতাশাজনক। আগে যেভাবে উপকূলে ইলিশ পাওয়া যেত, এখন সেভাবে পাওয়া যায় না। এর প্রধান কারণ ইলিশ উৎপাদন ও প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ঘাটগুলো বদলে ফেলায় ইলিশ আহরণ কমছে।’
মিরসরাই উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাইয়ে ২৯টি জেলেপল্লীতে নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ২ হাজার ১২৬ জন। ২০১৬ সালের আগে ২ হাজার ২৬ জেলে নিবন্ধিত হন। ২০২১ সালে নিবন্ধিত হন ১০০ জন। এছাড়া চলতি বছর প্রায় ৬০০ জেলে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন।
মৎস্য অফিসের দেয়া তথ্যানুসারে, মিরসরাইয়ে ২০১৮ সালে ইলিশ আহরণ হয় ৩৪২ দশমিক ১ টন। ২০১৯ সালে ১৯ দশমিক ৫ টন কমে দাঁড়ায় ৩২২ দশমিক ৬ টনে। যদিও ২০২০ সালে পূর্ববর্তী বছর থেকে ৪ দশমিক ৮ টন ইলিশ বেশি আহরিত হয়। অর্থাৎ ২০২০ সালে ইলিশ আহরণ হয় ৩২৭ দশমিক ৪ টন। এতে স্থানীয় জেলেদের মাঝে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল, কিন্তু ২০২১ সালে এসে আবারো ধাক্কা খান এখানকার জেলেরা। ওই বছর ইলিশ আহরণ হয় ২৫২ দশমিক ৩ টন, যা ২০২১ সালের তুলনায় ৭৫ দশমিক ১ টন কম। এভাবে প্রতি বছর কমতে থাকে ইলিশ আহরণ। ২০২২ সালে হঠাৎ ধস নামে ইলিশ আহরণে। ওই বছর আহরণ হয় মাত্র ১৪৭ দশমিক ৪ টন, যা ২০২১ সালের তুলনায় ১০৪ দশমিক ৯ টন কম। কিন্তু সেই ধাক্কা আর সামাল দিতে পারেননি মিরসরাইয়ের ২৯টি জেলেপল্লীর কয়েক হাজার জেলে। ২০২৩ সালে ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী আগস্ট পর্যন্ত ইলিশ আহরণ হয়েছে মাত্র ৩৭ দশমিক ৩ টন। এক বছরের ব্যবধানে আহরণ কমে যায় ১১০ দশমিক ১ টন। এ পরিস্থিতিতে হতাশা ভর করে জেলেদের মাঝে। অনেকে বদলে ফেলছেন পেশা। গত বছর আগস্টে ৪০ টন ইলিশ আহরিত হয়েছিল, কিন্তু চলতি বছর আগস্টে পাওয়া গেছে মাত্র আট টন।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। উৎপাদনে গেছে একাধিক শিল্প-কারখানা। এসব কারখানার বর্জ্য যদি সাগরে পড়ে তাহলে ইলিশের প্রজনন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মায়ানি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের জেলে রণজিৎ জলদাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইলিশ এখন সোনার হরিণ। ইলিশ আহরণের আশায় মাছ ধরা নৌকা ও জাল কিনতে স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। কিন্তু মাছ তো ধরা পড়ছেই না, বরং ঋণের কিস্তি দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
উপজেলার ডোমখালী জেলেপল্লীর কালাচান জলদাশ বলেন, ‘সাগর ও নদী দূষণ বেড়ে গেছে। তাই ইলিশ মাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এছাড়া মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি ভরাট কাজে বড় বড় ড্রেজার ব্যবহৃত হওয়ায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।’










