জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা ‘আনন্দের সঙ্গে শেখা’ কর্মসূচি দেশব্যাপী বাস্তবায়নে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষাকে জীবনঘনিষ্ঠ করতে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন কাজ করছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে দিনাজপুর সরকারি কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রংপুর বিভাগীয় পর্যায়ের আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আজ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
কলেজ মাঠে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন উড়িয়ে প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন কলেজের জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান ও স্বর্ণপদক পাওয়া ১ হাজার ১৫৪ জন শিক্ষার্থী-অ্যাথলেট অংশ নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ৭৫৪ জন ছাত্র ও ৪০০ জন ছাত্রী। ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কাবাডি, সাঁতার ও অ্যাথলেটিকসসহ মোট ৭২টি ইভেন্টে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করতে গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, প্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মানুষ তৈরির জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো দলাদলির জায়গা হওয়া উচিত নয়। তরুণদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। ‘আনন্দের সঙ্গে শেখা’ কর্মসূচির মাধ্যমে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী আরো বলেন, স্বাধীনভাবে কাজ ও আধুনিক প্রযুক্তির সুফল পেতে শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সারা দেশে বিস্তৃত অধিভুক্ত কলেজগুলোর অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে দ্রুত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে এসব দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ পৌঁছে দেয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন এ কাজ দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই লক্ষ্য।
তিনি বলেন, গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় আটকে থাকলে দেশের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও কর্মবাজারের চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষাব্যবস্থায় গতিশীলতা আনা জরুরি। এ লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ও পাঠ্যক্রম হালনাগাদের কাজ শুরু হয়েছে এবং সংস্কার কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংশোধিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের পাঠ্যক্রম অনলাইনে প্রকাশ করা হবে। শিক্ষার্থী ও সরকারের চাহিদা বিবেচনায় ভবিষ্যতে বিভিন্ন পেশাভিত্তিক ও দক্ষতাভিত্তিক কোর্স চালু করা হচ্ছে।
দিনাজপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দেন উপাচার্য। তিনি বলেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা গেলে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ আরো সহজে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।
অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেই শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় পর্যায়ে এসেছে। এখান থেকে যারা ভালো করবে, তাদের জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ তৈরি হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মাঠ থেকেই একদিন জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদ উঠে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, ক্রীড়া খাতে সরকার ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ সাময়িক নয়, দীর্ঘদিনের গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ধরে রাখতে ক্রীড়া ভাতা চালু করা হয়েছে। ‘নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া’ কর্মসূচির প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে। প্রতিটি জেলায় ক্রীড়া গ্রাম এবং উপজেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। খেলাধুলার সুযোগ বাড়িয়ে তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেয়ার গত সাত মাসে তরুণ ও তরুণীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে দুটি প্রশিক্ষণ পর্ব সফলভাবে শেষ হয়েছে। মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা স্বাধীনভাবে কাজের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হচ্ছেন। কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
তরুণ সমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুগঠিত করতে ক্রীড়াঙ্গনের ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই বলেও উল্লেখ করেন আমিনুল হক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপরিবার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিশাল যুবশক্তিকে শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলার মাঠে যুক্ত করাই লক্ষ্য। দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনগুলোতে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
তিন দিনব্যাপী এ প্রতিযোগিতা আগামী ৬ অক্টোবর ফাইনাল খেলার মধ্য দিয়ে শেষ হবে। বিভিন্ন ইভেন্টে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক অর্জনকারীরা পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাবেন।
উদ্বোধনী আয়োজনকে ঘিরে দিনাজপুর সরকারি কলেজ মাঠে সকাল থেকেই উৎসবের আমেজ ছিল। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী-অ্যাথলেট, শিক্ষক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মাঠজুড়ে প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হয়। প্রতিযোগীদের মধ্যে নিজেদের সেরাটা দেয়ার প্রত্যয় ছিল। দর্শকরাও প্রিয় দল ও খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল করিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দিনাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. লুৎফর রহমান।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) নাজিম উদ্দিন আহমেদ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা দপ্তরের পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শুদ্ধাচার দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ কামাল হাছান, জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা, উপাধ্যক্ষ মো. কামরুল হাসান প্রমুখ।










