দেশের প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পে বর্তমানে ‘প্যানেল অব এক্সপার্টস’ দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক এম শামীম জেড বসুনিয়া। বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান হিসেবে মেট্রোর নির্মাণকাজ তদারকির পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন খ্যাতিমান এ প্রকৌশলী। শুধু মেট্রোরেল নয়, প্যানেল অব এক্সপার্টস দলের প্রধান হিসেবে তিনি কাজ করেছেন পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পেও। বর্তমানে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্যানেল অব এক্সপার্টসের দলনেতা তিনি। ৭৮ বছর বয়সে এসেও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন দেশের প্রায় সব মেগা প্রকল্পে। টানেল, পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, স্টেডিয়াম, সড়ক, বহুতল ভবন—অবকাঠামো খাতের সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে ছাপ রেখেছেন।

বয়স হলেও কাজের স্পৃহা একটুও কমেনি অধ্যাপক বসুনিয়ার। এ সম্পর্কে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স ৮০ বছর হতে যাচ্ছে। কর্মজীবনে আমি পদ্মা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলসহ দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ঢাকার জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সাবওয়ে নির্মাণের জন্য যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে, সেখানেও কাজ করেছি। আমি মনে করি, এসব কাজের মাধ্যমে দেশের জন্য কিছু হলেও করতে পেরেছি। এ জীবনে এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই কাজ করে যেতে চাই।’

অধ্যাপক বসুনিয়ার জন্ম ১৯৪৪ সালের ৩১ জানুয়ারি। জন্মস্থান রংপুর। ১৯৬১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ভর্তি হন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, বর্তমানে যেটি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। পুরকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন ১৯৬৫ সালে। সে বছরই প্রভাষক হিসেবে বুয়েটে যোগ দেন। পরে বুয়েট থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ১৯৭২ সালে। পিএইচডি করেছেন যুক্তরাজ্যের স্ট্র্যাথক্লাইড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৮১ সালে তিনি বুয়েটে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০৯ সালে অবসরের আগ পর্যন্ত শিক্ষকতার পাশাপাশি বুয়েটের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের পুরকৌশল বিভাগে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ‘কংক্রিট কনস্ট্রাকশন’ বিশেষজ্ঞ হিসেবে চার দশক ধরে দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে কখনো টিম লিডার আবার কখনো সদস্য হিসেবে পরামর্শকের কাজ করেছেন অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়া। যমুনা নদীতে ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টারকানেক্টর ট্রান্সমিশন লাইন, বগুড়া ৫০০ শয্যা হাসপাতাল, উপকূলীয় এলাকার সাইক্লোন শেল্টার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও মিরপুর স্টেডিয়াম সংস্কার, ঢাকা সিটি সেন্টারের একাধিক বহুতল ভবন, মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামসহ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অসংখ্য ছোট-বড় সেতুর নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছেন এ বিশেষজ্ঞ।

উত্তরা-মতিঝিল-কমলাপুর মেট্রোরেল প্রকল্পে ‘প্যানেল অব এক্সপার্টস’ দলের চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক বসুনিয়া যোগ দেন ২০২০ সালে। তার আগে এ পদে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। প্যানেল অব এক্সপার্টস দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অধ্যাপক বসুনিয়া বলেন, ‘মেট্রোরেল প্রকল্পটির মাঝামাঝি সময়ে এসে আমাকে প্যানেল অব এক্সপার্টসের চেয়ারম্যান করা হয়। তার আগে এ প্রকল্পের কাজে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর বেশকিছু কারিগরি জটিলতার উদ্ভব হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বিয়ারিংয়ের ডিজাইন নিয়ে জটিলতা। এ বিয়ারিংগুলো অ্যাজ পার ডিজাইন অনুযায়ী হচ্ছে কিনা, সেটা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব আমার ওপর পড়ে। কাজটি দিয়েই মূলত আমি মেট্রোরেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। সে সময় আমরা বিয়ারিং ইস্যুটি নিয়ে একাধিক সভা করেছি। পরে নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিয়ারিংয়ের স্পেসিফিকেশন ঠিক করে দিই। বিয়ারিংগুলো দেশে আনার পর সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করি। তারপর আমরা সেগুলো স্থাপনের জন্য অনুমোদন দিই। পরবর্তী সময়ে আরো বেশকিছু কারিগরি সমস্যা আমাদের টেকনিক্যাল কমিটিতে এসেছে। এখনো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

মেট্রোরেল প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে বিশেষজ্ঞ দলে কাজ করলেও ঢাকার প্রথম মেট্রোর সুফল নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় রয়েছেন অধ্যাপক বসুনিয়া। বিশেষ করে শুরুতে শুধু উত্তরা-আগারগাঁওয়ের মধ্যে ট্রেন চলাচল এবং বিভিন্ন স্থানে স্টেশনের অবকাঠামো নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা বলছেন এ বিশেষজ্ঞ। বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ঢাকা শহর এত বিশৃঙ্খলভাবে গড়ে উঠেছে যে মেট্রোর সুফল পাওয়া নিয়ে শুধু আমি না, অনেকের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। মেট্রোর বেশ কয়েকটি স্টেশনের আশপাশে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা সম্ভব হয়নি। কোথাও কোথাও স্টেশনের সিঁড়ি ফুটপাত দখল করেছে। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সব মিলিয়ে স্টেশনগুলোতে বিশৃঙ্খলা হওয়ার একটা আশঙ্কা কিন্তু রয়ে গেছে। অন্যদিকে ২৯ ডিসেম্বর থেকে উত্তরা-আগারগাঁওয়ের মধ্যে বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হবে। আমি যতদূর জেনেছি আগারগাঁও পর্যন্ত আসা যাত্রীদের বিআরটিসির বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু আগারগাঁওয়ে এ বাসগুলো দিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে, যেটা যানজটেরও কারণ হতে পারে। মেট্রোরেলের পরিকল্পনা পর্যায় থেকেই এসব বিষয়ে চিন্তা করা উচিত ছিল, যেটা করা হয়নি।’