খেলাপি ঋণের ভারে কয়েক বছর ধরেই ধুঁকছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। তার পরও বিভিন্ন চার্জ ও কমিশনের ওপর ভর করে ভালো পরিচালন মুনাফা করছিল ব্যাংকগুলো। তবে এবার আর রক্ষা হয়নি। একদিকে মহামারীর তাণ্ডব, অন্যদিকে বাধ্যতামূলকভাবে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনায় পরিচালন মুনাফায় টান পড়েছে প্রায় সব ব্যাংকের। ২০২০ সালে দু-চারটি ছাড়া দেশের সবক’টি ব্যাংকেরই পরিচালন মুনাফা কমেছে।
বিদায়ী বছরে পরিচালন মুনাফা ৭০০ কোটি টাকা কমেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের। তা সত্ত্বেও বরাবরের মতো এবারো পরিচালন মুনাফায় শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের এ ব্যাংক। ২০২০ সালে ব্যাংকটি পরিচালন মুনাফা করেছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
মুনাফায় বড় ধস হয়েছে আইএফআইসি, মার্কেন্টাইল, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স, শাহজালাল ইসলামী, ওয়ান, সোস্যাল ইসলামী, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট ও প্রাইম ব্যাংকের। এ ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা কমেছে ২০ শতাংশের বেশি। আর পরিচালন মুনাফা ১০ শতাংশের বেশি কমেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, এনসিসি, যমুনা, আল-আরাফাহ্ ও ঢাকা ব্যাংকের। এছাড়া ডাচ্-বাংলা, পূবালী, এক্সিম ও ইস্টার্ন ব্যাংকেরও পরিচালন মুনাফা কমেছে। তবে দুর্যোগের মধ্যেও পরিচালন মুনাফা বেড়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, মধুমতি, ইউনিয়ন ও মেঘনা ব্যাংকের। এ ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহী বা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে, সেটিই কোনো ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা। পরিচালন মুনাফা কোনো ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। এ মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ এবং সরকারকে কর পরিশোধ করতে হয়। প্রভিশন ও কর-পরবর্তী এ মুনাফাই হলো একটি ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা। বছর শেষে ব্যাংকারদের দেয়া ইনসেনটিভ বোনাসও কিছু ব্যাংক পরিচালন মুনাফার মধ্যে হিসাবায়ন করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার ব্যাংকগুলো যে পরিচালন মুনাফা করেছে, সেটি প্রকৃত মুনাফা নয়। অনেক ব্যাংক অনাদায়ী সুদও আয়ের খাতে দেখানোয় পরিচালন মুনাফা কিছুটা ভদ্রস্ত দেখাচ্ছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে বাধ্যবাধকতা থেকে বছরব্যাপী ছাড় পেয়েছেন গ্রাহকরা। এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের বড় অংশই ঋণ পরিশোধ করেনি। নতুন বছরে খেলাপি ঋণের সময় গণনা শুরু হলে ব্যাংক খাত মন্দ ঋণের ভারে বিধ্বস্ত হবে। এছাড়া করোনাসৃষ্ট দুর্যোগকালের জন্য অশ্রেণীকৃতসহ ঋণের ১ শতাংশ অতিরিক্ত সঞ্চিতি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরিচালন মুনাফা থেকে অতিরিক্ত এ সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে অনেক ব্যাংকই লোকসানে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমার পেছনে প্রথম ধাক্কাটি ছিল ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা। করোনা মহামারী দ্বিতীয় ধাক্কা হিসেবে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় আঘাত করেছে। এক বছর ধরে গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপি হননি। অনেক গ্রাহকই সুযোগটি পুরোদমে কাজে লাগিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সুখকর নয়।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর ভিত শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১ শতাংশ অতিরিক্ত সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে বলেছে। এ অবস্থায় অনেক ব্যাংকের পক্ষেই বিদায়ী বছরে নিট মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হবে। খেলাপি ঋণের সময় গণনা শুরু হলে কিছু গ্রাহককে খুঁজে পাওয়া যাবে না। খেলাপি ঋণের অভিঘাত মোকাবেলার জন্য ব্যাংকগুলোকে এখনই প্রস্তুতি নেয়া দরকার।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড পরিচালন মুনাফা করেছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৯ সালে ব্যাংকটি ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা করেছিল। তবে ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলেছেন, গতকালও ব্যাংকের অনেক শাখা খোলা থাকায় হিসাব চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিচালন মুনাফার অংক আরো বাড়তে পারে।
বিদায়ী বছরে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিচালন মুনাফা করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ২০২০ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। যদিও এর আগে ২০১৯ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এ হিসেবে ডাচ্-বাংলার পরিচালন মুনাফা কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ।
আইএফআইসি ব্যাংক ২০২০ সালে মুনাফা করেছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। যদিও এর আগে ২০১৯ সালে ব্যাংকটি ৫১২ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছিল। এ হিসেবে আইএফআইসির পরিচালন মুনাফা ৪১ শতাংশ কমেছে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকেরও পরিচালন মুনাফা ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানা গেছে। ব্যাংকটি ২০২০ সালে ৪৫০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। আগের বছর ৭৫৩ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংক। পরিচালন মুনাফা ৩৭ শতাংশ কমেছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের। ব্যাংকটি ২০২০ সালে ৩৪০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। যদিও আগের বছর মিউচুয়াল ট্রাস্টের পরিচালন মুনাফা ছিল ৫৪০ কোটি টাকা।
এছাড়া ২০২০ সালে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ১৫০ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৪১৫ কোটি, ওয়ান ব্যাংক ৩১৫ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫০০ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ৭১০ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংক ৭৭০ কোটি, প্রাইম ব্যাংক ৫৬০ কোটি, ইউসিবি প্রায় ৭০০ কোটি, পূবালী ৯৩৫ কোটি, এনসিসি ৫৭১ কোটি, যমুনা ৬৪০ কোটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ৭১০ কোটি, ঢাকা ব্যাংক ৫৫০ কোটি, এক্সিম ৭৪১ কোটি, ইস্টার্ন ৮১০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম জানান, মহামারীর মধ্যে মুনাফা কত হলো সেটি বড় বিষয় নয়। শক্তিশালী ভিতের ওপর ব্যাংককে টিকিয়ে রেখে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখাকেই আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আগামী দিনে দেশের ব্যাংক খাতকে খেলাপি ঋণের তীব্র ঝড়ের মোকাবেলা করতে হবে। সেজন্য ব্যাংকের ভিত মজবুত করাটাই এ মুহূর্তে বেশি জরুরি। পরিচালন মুনাফা কম হলেও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড অনেক কমে এসেছে। ভবিষ্যতে আমরা এর সুফল পাব।
পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি পাওয়া এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ১৯০ কোটি, মধুমতি ২৭৮ কোটি, এনআরবিসি ৩২৩ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংক ৩০৫ কোটি ও মেঘনা ব্যাংক ৮৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। প্রথম প্রজন্মের ন্যাশনাল ব্যাংকও ৯৮০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে বলে জানা গেছে।
বিদায়ী বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী মো. আতাউর রহমান প্রধান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে সোনালী ব্যাংক ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফায় ছিল। বড় দুর্যোগ সত্ত্বেও আমরা ২০২০ সালে ২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছি। সোনালী ব্যাংক দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে। ডিসেম্বর শেষে আমাদের ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।










