নিজেদের পুরনো ‘ইন্সপেক্টর’ ও ‘সুপারিনটেনডেন্ট’ পদে ফিরতে চান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও বা রেভিনিউ অফিসার) ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা (এআরও বা অ্যাসিস্ট্যান্ট রেভিনিউ অফিসার)। এ দাবি আদায়ে শিগগিরই গণস্বাক্ষর নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাকাএভ)।

সংগঠনটির অভিযোগ, ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট অনুবিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ‘মতামত উপেক্ষা করে’ তৎকালীন সরকার ইন্সপেক্টর ও সুপারিনটেনডেন্ট পদ কেড়ে নিয়ে এআরও এবং আরও করে দেয়।

তবে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কেড়ে নেয়া হয়নি। মামলা সংক্রান্ত কারণে নতুন নামে নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। এআরও জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডের পদ। পরে পদোন্নতি পেয়ে তারা আরও হন।

একজন কাস্টমস কমিশনার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও রাজস্ব কর্মকর্তা পদবি নিয়ে অন্যান্য দপ্তরের কর্মীদের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা নাকি রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব কর্মকর্তা? এটা একটা ঝামেলা হয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তাদের দাবি যুক্তিসঙ্গত। এর একটা পটভূমি আছে। ৯০ এর দশকে মুজিব নগরীর কর্মচারী হিসেবে আদালতের রায় নিয়ে অনেক ব্যক্তি এনবিআরে যোগদান করতে থাকেন। তাদের অনেকের জন্ম ১৯৭১ এর পরে। তাদের কোয়ালিটি ভালো ছিল না। এ নিয়ে জটিলতা হয়। শেষে আদালত থেকে আদেশ দেয়া হয়, মুজিব নগরীর কর্মচারীদের বিষয়টা সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ বন্ধ থাকবে। এর ফলে প্রায় ১৮ বছর ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ বন্ধ ছিল। এ সুযোগে ক্লার্ক, সিপাই পদোন্নতি পেয়ে প্রচুর সংখ্যক ইন্সপেক্টর হয়ে যায়। ফলে অফিসারদের গুণগত মান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন চিন্তা করা হয়, কীভাবে ইন্সপেক্টর পদে সরাসরি নিয়োগ দেয়া যায়। তারপর পদ পরিবর্তন করে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) হিসেবে সরাসরি অফিসার নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। সম্ভবত ২০১৩-১৪ সাল থেকে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার অফিসার সরাসরি নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, এরই মধ্যে মুজিব নগরীর সবাই অবসরে গেছেন। কেউ চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তারা কেউ এখন নেই। সারা পৃথিবীতে ইন্সপেক্টর পদ ব্যাবহার করা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বত্র। এটা সম্মানজনক পদবি। এর সঙ্গে অন্য কোনো বিষয় নেই। সচিবালয়ে এক সময় যাদের পিএ বলা হতো তারা এখন পিও। অর্থাৎ পার্সোনাল অফিসার। এটা সম্মানজনক। এটুকুই সুবিধা। এআরও বললে সমাজে কেউ বোঝে না। ইন্সপেক্টর বললে সবাই বোঝে। তাদের দাবি যৌক্তিক। সরকারের কোনো ব্যয় হবে না। প্রায় ৫ হাজার এআরও আছেন। তাদের উৎসাহিত করা দরকার। টাকা খরচ না করে এতগুলো অফিসারকে উৎসাহিত করার এ সুযোগ সরকার গ্রহণ করবে, এটা আমাদের প্রত্যাশা। রাজস্ব আহরণের ওপর ভালো প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়।

এ দাবি আদায়ে শিগগিরই গণস্বাক্ষর নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাকাএভ)। অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, এরই মধ্যে তারা অর্ধেকের বেশি কর্মকর্তার সই সংগ্রহ করেছেন। এর আগে রোববার নিজেদের দাবি তুলে ধরে এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানকে চিঠি দেন বাকাএভ নেতারা। এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাতে এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস মেলে।

এনবিআরের আয়কর অনুবিভাগে ইন্সপেক্টর ও ভ্যাট অনুবিভাগে সাব-ইন্সপেক্টর পদ থাকায় তারা নিজেদেরকে ‘শুধু স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তে বৈষম্যের স্বীকার’ বলেও দাবি করছেন।

রোববার দুপুরে এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের কাছে এসব দাবি নিয়ে চিঠি দেন বাংলাদেশ কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাকাএভ) নেতারা। এনবিআর কার্যালয়ে গিয়ে তারা তাদের দাবিদাওয়ার কথা জানান। এ সময় এনবিআরের কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

বাকাএভের চিঠিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনের সভাপতি কে এম মাহবুব আলম ও মহাসচিব তানভীর আহমেদ।

বাকাএভের চিঠিতে বলা হয়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তে কাস্টমস বিভাগের ইন্সপেক্টর ও সুপারিনটেনডেন্টদের সঙ্গে কাজের সমন্বয়ে এমনকি সমুদ্রগামী জাহাজে কিংবা বিমানবন্দরে কার্যক্রমেও এনবিআরের রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা পরিচয় দিতে গিয়ে ‘পরিচয় সংকট’ বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস অনুভব করেন। কারণ, বিদেশী জাহাজের ক্যাপ্টেন বা বিমানের পাইলট সবার কাছে ইন্সপেক্টর ও সুপারিনটেনডেন্ট পদবিতে পরিচিত। তাই ইন্সপেক্টর ও সুপারিনটেনডেন্ট পদবি পুনর্বহাল করার দাবি জানানো হয়।

চিঠিতে আরো বলা হয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ইন্সপেক্টর ও সুপারিনটেনডেন্ট পদবি কাস্টমসের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের গৌরব ও ঐতিহ্য বহন করে যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। এ ছাড়া পদবি পুনর্বহালে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ নেই।

মঙ্গলবার (৬ মে) বাকাএভের সভাপতি কে এম মাহবুব আলম বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা সদস্য (কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন) স্যারের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, একটা পজিটিভ রেজাল্ট আসতে পারে। তিনি তার জায়গা থেকে এটা বলেছেন। আর চেয়ারম্যান স্যার অর্থ উপদেষ্টা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছেন। এখন কর্মকর্তারা অপেক্ষা করছেন। আমাদের আসলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সুদৃষ্টি প্রয়োজন। এতে কোনো এক্সট্রা বেনিফিট যুক্ত হবে না। কিন্তু যেটা যুক্ত হবে, সেটা হচ্ছে রেপুটেশন। আসলে গ্লোবালি ইন্সপেক্টর ও সুপারিনটেনডেন্ট- এসব নামে পরিচিত।

তিনি বলেন, আরও এবং এআরও- এসব পদের ব্যাপক ব্যবহার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতে রয়েছে। এটার জন্য আমরা একটু বেকায়দায় পড়ে যাই। এছাড়া এসব নামের সুনাম নানাভাবে নষ্ট হয়েছে।