অপরিকল্পিত আবাসনসহ বিভিন্ন কারণে ঝিনাইদহে কমছে ঝোঁপ-জঙ্গলের পরিমাণ। তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্য সংকটে পড়েছে জেলার নদ-নদীগুলো। এতে খাদ্য ও আবাস সংকটে পড়েছে জলজ ও বন্যপ্রাণী। মাঝেমধ্যে খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে আশ্রয় নিলেও জনতার হিংস্রতার শিকার হচ্ছে অস্তিত্ব সংকটে পড়া প্রাণীগুলো। কুমির, শুশুক, মেছোবাঘ কিংবা গন্ধগোকুল—কোনো প্রাণীই বাদ পড়ছে না। সামনে মিললেই ফাঁদ পেতে বা তাড়া করে ধরা হচ্ছে এসব প্রাণী। পিটিয়ে হত্যার পর ঝুলিয়ে উল্লাস করার ঘটনাও ঘটছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, একের পর এক প্রাণী হত্যা করা হলেও স্থানীয় বন বিভাগ ও প্রশাসন নির্বিকার। হত্যার ছবি, ভিডিও থাকলেও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি জনসাধারণকে সচেতন করতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। শুধু তা-ই নয়, গত কয়েক বছরে কতগুলো বন্য ও জলজ প্রাণী হত্যা করা হয়েছে সেই তথ্যও নেই স্থানীয় বন বিভাগের কাছে।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ কার্যকর রয়েছে। আইন অনুযায়ী, যেকোনো বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার বা বাসস্থান ধ্বংস করা অপরাধ। আইনের ধারা ৩৮ (১) অনুযায়ী, সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা বা শিকার করলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে সচেতনতার অভাব ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে প্রাণী হত্যা থামছে না।

সম্প্রতি শৈলকুপার হাকিমপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে খাবারের খোঁজে একটি বিলুপ্তপ্রায় কুমির লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। উত্তেজিত জনতা কুমিরটিকে পিটিয়ে ভ্যানে করে শৈলকুপা থানায় নিয়ে আসে। পরে পুলিশের হেফাজতে রেখে রাতেই তা খুলনা বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনার এক মাস না পেরোতেই গড়াই নদীতে জেলেদের জালে আটকা পড়ে একটি শুশুক। পানি থেকে ডাঙ্গায় ওঠাতেই কিছু সময় পর শুশুকটি মারা যায়। সবশেষ পৌরসভার সাতগাছিতে একটি মেছোবাঘ ধানখেতে আশ্রয় নেয়। ধান কাটা মেশিনে গুরুতর আহত হয় মাঘটি। আহত অবস্থায়ই স্থানীয় জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। পরে তা ঝুলিয়ে উল্লাস করতে দেখা গেছে। করা হয় ফেসবুক লাইভও।

এভাবে একের পর এক বিরল প্রজাতির প্রাণী হত্যার ঘটনা প্রাণ-প্রকৃতিতে বিপর্যয় ডেকে আনছে। গত কয়েক বছরে এসব প্রাণী হত্যার ঘটনা কয়েকশ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সাংবাদিক বিমল কুমার সাহা বলেন, ‘আইনে বন্য ও জলজ প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ থাকলেও একের পর এক এসব প্রাণী হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন এগুলোর খোঁজ রাখে না। প্রাণীগুলো রক্ষায়ও কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এ অবস্থা চলতে থাকলে এসব প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

তাজনুর রহমান ডাবলু নামে আরেক সাংবাদিক বলেন, ‘বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রাণী রক্ষায় বন বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পোস্টারিং, মাইকিং, সভা-সমাবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে জনসাধারণ সচেতন হয়।’

সংস্কৃতিক কর্মী ও সাংবাদিক আলমগীর অরণ্য বলেন, ‘একাধিক হত্যাকারীর ছবি-ভিডিও থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর ফলে দিনদিন এমন ঘটনা বেড়েই চলেছে। হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করলেই এমন ঘটনা কমে যাবে।’

পরিবেশবিদরা বলছেন, নগরায়ণের ফলে বনাঞ্চল কমে যাচ্ছে। এতে বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা কমে যাওয়ায় অকারণে অহরহ বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনাও ঘটছে। মানুষের প্রয়োজনে দেশের প্রতিবেশ ঠিক রাখতে বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় বন বিভাগ ও প্রশাসনের দায়িত্বহীনতায় বাড়ছে এ হত্যাকাণ্ড। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধিতে পোস্টারিং, মাইকিং কিংবা সভা-সমাবেশ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

প্রাণ-পরিবেশ-প্রতিবেশ সংগঠক সুজন বিপ্লব বলেন, ‘বন্য ও জলজ প্রাণী নির্বিচারে হত্যার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। উন্মত্ত মবের হাতে ধারাবাহিকভাবে গন্ধগোকূল, কুমির, শুশুকসহ বন্য ও জলজ প্রাণী হত্যার শিকার হলেও জনগণকে সচেতন করতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মানুষের বাসযোগ্য আবাসভূমির প্রয়োজনে এসব জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী বন্য ও জলজ প্রাণীগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। এসব প্রাণী হত্যা বন্ধে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তবে জনবল সংকট ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকার কথা জানিয়ে শৈলকুপা উপজেলা বন কর্মকর্তা মোকলেচুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে আমরা মাঠপর্যায়ে সব সময় কার্যকরভাবে কাজ করতে পারি না। এত বড় উপজেলায় বনভূমি ও প্রাণী রক্ষার দায়িত্ব এত অল্প জনবলের কাঁধে চাপানো হয়েছে। প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় অনেক সময় বন্যপ্রাণী রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলেই প্রকৃতপক্ষে বন, বন্য ও জলজ প্রাণীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এসব প্রাণী ধরা ও হত্যা বন্ধে জনসচেতনতা বাড়তেও শিগগিরই পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্নিগ্ধা দাস বলেন, ‘জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাণী হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনতে বন বিভাগকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। শুধু প্রশাসন নয়, প্রাণী হত্যা বন্ধে সচেতন মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।’