দেশে ডেঙ্গুর মৌসুম ধরা হয় সাধারণত মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি পরিবর্তিত হয়ে জুলাই, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে কিছু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এ সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে, বিশেষ করে জুলাই ও আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ হয়। চলতি অর্থবছরে শুধু মশক নিধনে ২ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। তবে নগরবাসী বলছেন, কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছড়ানো ছাড়া কার্যকর আর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছর ৪৯১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এখনো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১৬ জন। এর মধ্যে গত সপ্তাহে আক্রান্ত হয়েছে ১৫ জন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন জানান, ডেঙ্গুর ভয়াবহতা রোধে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সরকারি অফিসে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীর জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ডেডিকেটেড ওয়ার্ডও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা দমনে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) থেকে ২ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ৪ হাজার লিটার লার্ভিসাইড (টেমেপস ৫০ ইসি) এবং ২৫ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড (ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি) ক্রয় করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সমপরিমাণ ওষুধ ক্রয় করেছিল সিসিক।
তবে নগরবাসীর অভিযোগ, বছরে কয়েক কোটি টাকার ওষুধ ক্রয় করলেও সে তুলনায় সেবা মিলছে না। অবশ্য সিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, ৩০-৪০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। মশক নিধনে সিসিকের স্থায়ী কোনো কর্মী নেই। প্রতি বছর দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কিছুসংখ্যক কর্মীকে দিয়ে মশা নিধনে কাজ করানো হয়। যদিও বাস্তবে বছরে এক-দুবার এসব কর্মীকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে দেখা যায়।
এ ব্যাপারে সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যে জনবল নিয়ে কাজ করছি, তা যথেষ্ট নয়। ওয়ার্ডভিত্তিক কমপক্ষে চার-পাঁচজন কর্মী ও সুপারভাইজার নিয়োগ দিতে হবে। এ হিসাবে সিলেট নগরীর ৪২টি ওয়ার্ডে অন্তত দুই শতাধিক কর্মী প্রয়োজন। এসব কর্মীর বেতন-ভাতা সিসিকের পক্ষে একা বহন করা সম্ভব নয়। তাই আর্থিক সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে কোনো কর্মী নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
নগরের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নগরে মশা নিধনের জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৫ জন কর্মী ও সাতজন সুপারভাইজার দৈনিক মজুরিতে কাজ করছেন, যা যথেষ্ট নয়।’
ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২০২১ সাল থেকে কর্মী নিয়োগের পরামর্শ দিয়ে আসছি। কিন্তু নানা জটিলতায় তা আর হয়ে ওঠেনি। মশা নিধনের জন্য নগরীতে বছরে দুই-তিনবার বিভিন্ন স্থানে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। নিয়ম হচ্ছে প্রতি মাসে কীটনাশক ব্যবহার করা। তাই বাস্তবিকভাবে স্থায়ী সুফল পাওয়া সম্ভব হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত নগরবাসী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন না করবেন এবং সচেতন না হবেন ততক্ষণ পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. নূরে আলম শামীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকা উদ্বেগজনক। তবে এ বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে বাসাবাড়ি ও চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে।’
নগরে মশার উপদ্রব ছাড়াও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে কেউ না কেউ। নগরীর বন্দরবাজারের মধুবন সুপার মার্কেটে একটি অফিসের কর্মকর্তা ছাদেক আহমদ আজাদ বলেন, ‘মশার উপদ্রবে অফিসে বসে কাজ করা যায় না। বার বার চেয়ার ছেড়ে উঠতে হয়। মাঝে মাঝে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়, তবে তাতে কাজ হয় বলে মনে হয় না।’
সার্বিক বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বর হলে মশারি ব্যবহার করতে হবে। ঢাকা থেকে জ্বর নিয়ে কেউ এলে তার ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। বাসার আশপাশে পানি না জমানো এবং নিজের বাড়িন আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে।’










