দেশে জাহাজ ভাঙা শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১৬ হাজার টাকা। ট্যানারি শ্রমিক ও দর্জির সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৮০০ টাকা। ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি ১০ হাজার টাকার বেশি। যদিও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষককে মাসে সাকল্যে বেতন দেয়া হচ্ছে মাত্র ১০ হাজার টাকা, যা ২০১৫ সালে করা জাতীয় বেতন কাঠামোর সর্বনিম্ন ধাপের চেয়ে সামান্য বেশি। অবিশ্বাস্য হলেও বছরের পর বছর এমন নিম্নহারের বেতন কাঠামোই অনুসরণ করছে ফরিদপুরের টাইমস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কর্মরত পাঁচজন প্রভাষকের মধ্যে দুজনকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হচ্ছে। বাকি তিনজন পান মাসে ২০ হাজার টাকা হারে।
শুধু প্রভাষক নয়; বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্য শিক্ষকদেরও নিম্নহারে বেতন দেয়া হচ্ছে। টাইমস ইউনিভার্সিটির গত কয়েক মাসের বেতন বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতনভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১০ জন। এর মধ্যে দুজন অধ্যাপককে উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেখানো হয়েছে। এ দুজন অধ্যাপক মাসে ১৫ হাজার টাকা করে বেতন পান। সহযোগী অধ্যাপক পদে বেতনভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন একজন। তার মাসিক বেতনের পরিমাণ ৫৫ হাজার টাকা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অফিশিয়ালদের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর সিনিয়র লেকচারার পদে থাকা বাকি দুই শিক্ষক প্রতি মাসে ৩২ হাজার টাকা করে বেতন নিচ্ছেন।
অর্থ সংকটের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন কাঠামোর দৈন্যদশা বলে জানিয়েছেন টাইমস ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এএইচএম আক্তারুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের প্রধান উৎস শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। এখানে সব প্রোগ্রাম মিলে শিক্ষার্থী সংখ্যা দেড়শর মতো। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় নির্বাহ সম্ভব নয়। তাই বোর্ড অব ট্রাস্টিজের অনুদান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
বেতন কাঠামোর এমন দৈন্যদশার বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির এ অধ্যাপক বলেন, আমার জানামতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকদের মাসে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। সেটিও খুব কম। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় এর চেয়ে বেশি বেতন দেয়া সম্ভবও হয় না। তবে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়াতে পারব।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো চাকরিবিধি না থাকার কারণে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বেতনেই চাকরি করতে হচ্ছে তাদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে চাকরির বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। এজন্য বাধ্য হয়েই চাকরিটি করা লাগছে। এখানে কিছু সময় চাকরি করলে সে অভিজ্ঞতা সনদ নিয়ে অন্য কোথাও চাকরির আবেদন করা যাবে, সে আশায় চাকরিটি করা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে পাঠদানের বাইরেও অনেক কাজ করতে হয়। এর মধ্যে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি, পরীক্ষা নেয়া, পরীক্ষার খাতা দেখা, ফলাফল তৈরি করাসহ বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কাজ ও দায়িত্বের অতিরিক্ত ভাতা দেয়া হচ্ছে। সেখানে আমাদের ১০-২০ হাজার টাকা বেতন দেয়া হচ্ছে, এটা অমানবিক ও অসম্মানজনক। সত্যি কথা বলতে পরিবারের সদস্যদের কাছেও বেতনের পরিমাণ বলতে পারি না।
বেতন কাঠামোয় এমন দুর্বলতাই শুধু নয়, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আর্থিক শৃঙ্খলারও অনুপস্থিতি রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থবছরেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা করা হয়নি। যদিও আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি বছরের আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা এবং সে প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া বাধ্যতামূলক।
এ বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক অর্থবছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সংরক্ষিত তহবিল এবং সাধারণ তহবিলের হিসাব কমিশন ও সরকারের কাছে পাঠাতে হবে।’ আর হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি অর্থবছরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করবে। উল্লিখিত হিসাব প্রতি অর্থবছর বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত বহির্নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোর (সিএ ফার্ম) মধ্য থেকে সরকার মনোনীত একটি ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষা করাতে হবে এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরবর্তী অর্থবছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কমিশনে পাঠাতে হবে।’
এছাড়া আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ফাইন্যান্স রিপোর্ট (পিইউএফআর) শীর্ষক একটি ছক রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি)। সেটিও অনুসরণ করছে না টাইমস ইউনিভার্সিটি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেদের কাছেও আয়-ব্যয়ের গোছানো কোনো হিসাব নেই। আয়-ব্যয়ের লেনদেন সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে করা বাধ্যতামূলক হলেও সেটি অনুসরণ করা হচ্ছে না। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেয়া হচ্ছে নগদ অর্থে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, আমার চাকরিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আর্থিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ছিল একজন ট্রাস্টির। সব আয়-ব্যয়ের হিসাব তার কাছেই থাকত। তার কাছে থাকা হিসাব তিনি কখনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বুঝিয়ে দেননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিবিধি প্রণয়ন ও অনুসরণে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। যদিও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখাচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। আইন ও নির্দেশনা অনুসরণ না করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে কমিশন। এছাড়া বেতনের বিষয়টি শুধু অর্থসংস্থানের বিষয় নয়; এটা সামাজিক মর্যাদাও বটে। যে জাতি শিক্ষকদের সম্মান দিতে পারে না, সে জাতি কখনো উন্নত হতে পারে না। আমরা এখন গুণগত উচ্চশিক্ষার কথা বলছি। এর জন্য সবার আগে দরকার যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। কিন্তু নিম্নমানের বেতন কাঠামো দিয়ে কি আমরা ভালো শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারব? আর বেতন কাঠামো ঠিক না করে তো একজন শিক্ষকের কাছ থেকে মানসম্মত পাঠদান আশা করাও সমীচীন নয়।
দেশে সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নির্ধারিত বেতন কাঠামো রয়েছে। যদিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোনো ধরনের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়নি। কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের উদ্যোগে প্রণয়ন করলেও জাতীয়ভাবে অনুসরণ করার মতো কোনো কাঠামো নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেয়া হয় জাতীয় বেতন কাঠামোর নবম গ্রেডে। সেখানে একজন প্রভাষক মাসে ৩৫-৪০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পান। একইভাবে সরকারি কলেজের প্রভাষকরা নবম গ্রেডে বেতন পান। এমপিওভুক্ত কলেজের প্রভাষকরা যোগদানের মাস থেকেই পান ২১-২৪ হাজার টাকা। মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষকরা পান ২০-২৫ হাজার টাকা। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক চাকরিতে যোগদানের মাস থেকে ১৬ হাজার টাকার বেশি বেতন-ভাতা পান। এছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্রিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন হারে অতিরিক্ত ভাতা ও সম্মানী পান শিক্ষকরা।










