এ সময় মুহুর্মুহু বোমা বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় যশোর টাউন হল ময়দান। হামলায় প্রাণ হারান ১০ জন। গুরুতর আহত হন আড়াই শতাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী ও দর্শক। ওই ঘটনায় আহতদের একজন উদীচী কর্মী সুকান্ত দাস। আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি। এক পা হারিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাত ও কান। সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু বিচার করেনি কেউ। সবাই বিচারের নামে প্রহসন করেছে—বলছিলেন সুকান্ত দাস।

সুকান্ত ছিলেন তখন তরুণ। এখন বয়সের সঙ্গে শরীরে বেঁধেছে রোগ। মার্চ এলেই তাকে তাড়া করে দুর্বিষহ স্মৃতি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘২৭ বছরে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা যায়নি। এমনকি মামলার কী অবস্থা সেটাও আমরা কেউ জানি না। একটি পা কেটে কৃত্রিম পা লাগিয়ে হাঁটতে হয়। ২০২২ সালে ভারত থেকে কানে অপারেশন করেছি। প্রতিনিয়ত পায়ে যন্ত্রণা করে। বেশি হাঁটতে পারি না। হাত দিয়ে লিখতে পারি না। ২৭ বছর ধরে বাম হাত দিয়ে খাওয়া, লেখাসহ যাবতীয় কাজ করতে হয়। এত কষ্টের পরও এটা বলতে লজ্জা লাগে; এখনো রাষ্ট্রের কাছে বিচার পেলাম না।’

২৭ বছর আগে যশোরে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরপর দুটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ১০ জন। আহত হয় আড়াই শতাধিক মানুষ। নিহতরা হলেন নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রানী ঘোষ, নূর ইসলাম, ইলিয়াস মুন্সী, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম মিলন, মোহাম্মদ বুলু, রতন কুমার বিশ্বাস, শাহ আলম পিন্টু ও বাবু রামকৃষ্ণ। উদীচী ট্র্যাজেডির ২৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ বেলা সাড়ে ১১টায় প্রতিবাদী সমাবেশ ও সন্ধ্যায় শহীদদের স্মরণে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

টাউন হল ময়দানের রওশন আলী মঞ্চের পাশে নিহতদের স্মরণে পরবর্তী সময়ে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। মার্চ মাস এলেই প্রিয় ভাই তপনসহ ১০ সাংস্কৃতিক কর্মীর স্মৃতিতে তৈরি সেই স্তম্ভে সময় কাটান বিউটি আক্তার। অজান্তে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে বেদনার অশ্রু। এক বুক হতাশা নিয়ে বিলাপ করেন তিনি। ভাই হারানোর বেদনার থেকে, ২৭ বছরেও বিচার না পাওয়ার কষ্টটাই যেন বেশি ছিল। নিহত তপনের বোনের আক্ষেপ, তার মা-সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। তিনিও অসুস্থ, ভাই হত্যার বিচার দেখতে পারবেন কিনা সংশয়ে আছেন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, ‘সরকারের পর সরকার পরিবর্তন হলো; সহকর্মীদের হত্যার বিচার পেলাম না। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ২৬ বছর পার হলেও বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি মূল ঘাতকদের। এমনকি কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছিল, তাও উদঘাটন হয়নি। একতরফা বিচার চাইতে চাইতে এখন আর বিচার চাই না।’

উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, ‘যারা এ ঘটনায় আহত হয়েছিলেন তারা এখনো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের মানবেতর জীবনযাপন, অসহায়ত্ব আমাদেরও অসহায় করে তোলে। পাশাপাশি যে ১০টি পরিবার স্বজন হারিয়েছে; তাদের পরিবারও আমাদের কাছে বিচারের জন্য তাগিদ দেয়। বহুবার আমরা বিভিন্ন জায়গায় বিচারের দাবিতে তাগাদা দিলেও রাষ্ট্র বিচার করেনি।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু জানান, সিআইডির ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত থেকে খালাস পেয়ে যান মামলার সব আসামি। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। তবে তা-ও আটকে পড়ে আইনের বেড়াজালে। উচ্চ আদালতে আপিল শুনানিতে ঝুলে আছে মামলার বিচারিক কার্যক্রম।