গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমীর মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বানার নদী। দিনের আলো মিলিয়ে গেলে চারপাশ যখন নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখনো নদীর বুকে নৌকা ভাসিয়ে জেগে থাকেন একজন। নাম তার পরশ মাঝি। তীব্র শীত কিংবা ঝড়-বৃষ্টির রাতেও কখনো ঘরে থাকেননি।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার কুড়িয়াদী খেয়াঘাটসংলগ্ন জীর্ণ ঘরে থাকেন তিনি। সন্তান নেই, স্ত্রীকে নিয়েই তার অভাবের সংসার। অন্য এলাকার খেয়াঘাট রাতের বেলায় বন্ধ হয়ে গেলেও বরমী খেয়াঘাট প্রাণবন্ত করে রাখেন পরশ মাঝি। দিনের মাঝিরা নৌকা বন্ধ করে চলে গেলে পরশ তার বৈঠা আর নৌকা নিয়ে বের হয়ে আসেন। রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত বরমী খেয়াঘাট থেকে কুড়িয়াদী খেয়াঘাট পর্যন্ত যাত্রী পার করাই তার প্রতিদিনের কাজ। এভাবেই টানা ৫০ বছর ধরে নদীর দুই পাড়ের মানুষের ভরসা হয়ে আছেন তিনি।
আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে এখন যাত্রী নেই বললেই চলে। রাতে যাত্রীদের কাছ থেকে কখনো নির্দিষ্ট ভাড়া দাবি করেন না তিনি। যে যা দেন, তা-ই নেন। কেউ কিছু না দিলেও মুখে অভিযোগ নেই।
নির্জন রাতে নদীতে নৌকা চালাতে চালাতে গান ধরেন পরশ মাঝি। তার গান শুনতে আশপাশের অনেকেই অনেক সময় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। কারো কাছে তা শুধু বিনোদন নয়, গভীর রাতের ক্লান্তি ভুলে থাকার একমাত্র সঙ্গীও।
পরশ মাঝি বলেন, ‘শুধু মানুষের উপকারের জন্য রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়েছি। রাতের বেলায় যাত্রী হয় খুব কম। এমন রাতও যায় বিনে পয়সায় ঘরে ফিরতে হয়। অভাব আর দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে সংসার চালাতে হয়। এর পরও রাত শেষে মানুষের উপকার করার আনন্দ নিয়েই ঘরে ফিরি।’
রহিমা খাতুন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘একদিন পরশ মাঝি অসুস্থ ছিলেন। সেই রাতেই আমার প্রসব ব্যথা ঊঠেছিল। গভীর রাতে তাকে ডেকে আনা হয়। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি একবারও না করেননি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলেও বানার নদীর এ পারাপারে পরশ মাঝির অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জীবনের দীর্ঘ সময় মানুষের সেবায় কাটালেও তার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।’










